নিজস্ব প্রতিনিধিঃ দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালান ও অবৈধ পণ্য পাচারের যে অভিযোগ শোনা যায়, সেই আলোচনায় বারবার উঠে আসছে এক নাম—কামাল হোসেন। স্থানীয় সূত্র ও ব্যবসায়ী মহলের দাবি, এক সময় সাধারণ কুরিয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করা এই ব্যক্তি বর্তমানে কথিতভাবে শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।
জানা যায়, কর্মজীবনের শুরুতে কামাল মোবাইলের লোড ও ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বেনাপোল কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার সার্ভিসের বেনাপোল অফিসের দায়িত্ব নেন। অভিযোগ রয়েছে, এই কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করেই ধীরে ধীরে চোরাচালান পণ্য পারাপারের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এখান থেকেই কামালের উত্থান শুরু।
কামাল হোসেন বেনাপোল ৫ নম্বর দিঘীরপাড় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হক খোকেনের ছেলে। এলাকাবাসীর দাবি, যিনি একসময় নুন আনতে পানতা ফুরানোর অবস্থায় ছিলেন, তিনিই আজ বেনাপোল কাগজপুকুর এলাকায় বিলাসবহুল মার্কেট, দিঘীরপাড়ে আলিশান বাড়ি, যশোর শহরে একাধিক জমি ও ফ্ল্যাটের মালিক। দামি গাড়িতে চলাফেরা করাও তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের চাপ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে কামাল সাংবাদিকতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা সীমিত হলেও বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তিনি দেশের বহুল প্রচারিত দৈনিক যুগান্তর ও যমুনা টিভির বেনাপোল প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিতি পান। তার বিরুদ্ধে ভুয়া ও জাল সার্টিফিকেট ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে তিনি নাভারণ কলেজে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ কোর্সে অধ্যয়নরত, যার রোল নম্বর ২০-০-২৩-৯২৫-০০৫।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে জানান, সাংবাদিক পরিচয়ের ছত্রচ্ছায়ায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করাই ছিল তার মূল কৌশল। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট পত্রিকায় নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এই নীরব চাঁদাবাজির মাধ্যমেই অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হন কামাল—এমনটাই দাবি স্থানীয়দের।
আরও অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকতার আড়ালে কামালের স্মাগলিং ও হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গেও সম্পৃক্ততা রয়েছে। বেনাপোল সীমান্ত এলাকার একাধিক চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার সখ্যতার কথাও উঠে এসেছে। কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার সার্ভিস পরিচালনার সময় চোরাচালানি চন্দন কাঠ বহনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিজিবির মামলা রয়েছে বলেও জানা যায়।
কাস্টমস ও স্থলবন্দরের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, বেনাপোল কাস্টম হাউসে পণ্য খালাসকে কেন্দ্র করে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের সঙ্গে কামালের নাম জড়িত। সম্প্রতি একটি পার্টসের চালান আটক হওয়ার পর তা ছাড় করাতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলেও অভিযোগ ওঠে। এছাড়া শরিফুল নামের এক ব্যবসায়ীর পণ্য বিশেষ সুবিধায় খালাস করিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কথাও আলোচনায় এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী জানান, বেনাপোল স্থলবন্দরে সাংবাদিক পরিচয়ধারী কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির একটি বলয় তৈরি হয়েছে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও এসব সিন্ডিকেটের মধ্যে পারস্পরিক যোগসাজশে সৎ কর্মকর্তারা চাপে পড়েন, আর বাধা দিলেই তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সংবাদ প্রকাশ করা হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, সাংবাদিকতার মতো পেশায় যেখানে স্বাভাবিকভাবে সংসার চালানো কঠিন, সেখানে দৃশ্যমান কোনো বড় ব্যবসা ছাড়াই কামালের বিপুল সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা জরুরি। তারা দুদকসহ সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত ও অবৈধ সম্পদের হিসাব চেয়েছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কামাল হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে অভিযোগ সম্পর্কে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।











