বিশেষ প্রতিবেদকঃ গত জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরকে সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদী চক্রের অবৈধ অর্থ সংগ্রহের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিশেষ করে যেসব বিভাগে প্রকল্প ও বাজেটের পরিমাণ বেশি, সেসব জায়গায় দীর্ঘদিন ধরেই ঘুষ, কমিশন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে আলোচিত। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই তথাকথিত ‘লাভজনক’ বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিল ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪-এ সাধারণত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের আস্থাভাজন ও পরীক্ষিত প্রকৌশলীদেরই পদায়ন দেওয়া হতো। অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি নিয়মিতভাবে এই বিভাগ থেকে বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করতেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ–৩-এ নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মো. মাসুদ রানা সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামীপন্থী মহলের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজনে পরিণত হন। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই তাকে পরবর্তীতে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
২০২২–২৩ এবং ২০২৩–২৪ অর্থবছরে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ–৩-এ দায়িত্ব পালনকালে এপিপি প্রকল্পের কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর ফলে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ আওয়ামীপন্থী ঠিকাদারদের হাতে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য, দরপত্র প্রক্রিয়ায় কৌশলগত পরিবর্তন এনে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হতো। গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ছাত্রজীবন থেকেই মো. মাসুদ রানা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ছাত্র ও জনতার ওপর হামলা ও গণহত্যা সংক্রান্ত একটি মামলায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারসহ ১৫ জন কর্মকর্তা আসামি হলেও রহস্যজনকভাবে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার নাম মামলার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। এই বিষয়টি প্রশাসনিক ও আইনগত মহলে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠে এসেছে, মামলাটি নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বাদীর সঙ্গে দেন-দরবার চালাচ্ছেন সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ও তার ঘনিষ্ঠ অনুসারীরা। মামলার মীমাংসার জন্য বিপুল অর্থ সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয় মোহাম্মদ শামীম আখতারের আস্থাভাজনদের ওপর। সেই তালিকায় নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার নামও রয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর এপিপির একাধিক প্রকল্পে এলটিএমের পরিবর্তে এনসিটি পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়, যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কারণ এর আগেই প্রধান প্রকৌশলীর পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট ই-জিপি আইডি নম্বর—১০৩৫৯১০, ১০৩৫৯৩৩, ১০৩৫৯৮৯, ১০৩৬১২৯, ১০৩৬১৪৬, ১০৩৬৪১৫, ১০৩৬৯৫৮ ও ১০৩৭১৩৪—সংক্রান্ত দরপত্র বিষয়ে স্পষ্ট অফিস আদেশ জারি করা হয়েছিল। অথচ সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করেই দরপত্র আহ্বান করা হয়।
উল্লিখিত প্রকল্পগুলোর অধিকাংশই পূর্ত ভবন ও মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে ১০৩৫৯১০ ও ১০৩৬১২৯ নম্বর আইডির কাজ ছিল ফার্নিচার সরবরাহের। প্রশ্ন উঠেছে—গণপূর্ত অধিদপ্তরের নিজস্ব গণপূর্ত কারখানা বিভাগ থাকা সত্ত্বেও কেন এই ফার্নিচার সরবরাহের দরপত্র ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪ থেকে আহ্বান করা হলো। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত অর্থ সংগ্রহই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
হাসপাতালের বিশেষ বরাদ্দের একাধিক প্রকল্পেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয় এবং নামমাত্র কাজ দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগাভাগি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এসব অনিয়মের মূল হোতা হিসেবে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার নাম উঠে এসেছে।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরেও এপিপি বরাদ্দের পাঁচটি কাজে এলটিএমের পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এসব কাজ থেকেও মোটা অঙ্কের কমিশন লেনদেন হয়েছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে গণপূর্ত অঙ্গনে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—অফিস আদেশ উপেক্ষা করে দরপত্র পদ্ধতি বদলের নেপথ্যে কারা জড়িত? নিজস্ব কারখানা থাকা সত্ত্বেও ফার্নিচার সরবরাহে বাইরের দরপত্র আহ্বানের উদ্দেশ্য কী? মামলা থেকে নাম বাদ পড়া কি নিছক কাকতালীয়, নাকি প্রভাব খাটানোর ফল? গণ–অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই ‘স্বর্ণখনি’ বিভাগগুলোতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।











