পতেঙ্গা টার্মিনালে তেলচুরির সাম্রাজ্য ও ৪৮১ কোটি টাকার লেনদেন; সবকিছুর নেপথ্যে আছেন ডিএম সাঈদুল রহমান

🕒 প্রকাশিত: ২৭ , ২০২৫ (বৃহস্পতিবার) সময়: ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ | পোস্ট করেছেন: Reporter | 📍 দৈনিক সবুজ বিপ্লব

image_pdfSaveimage_print

এসএম ব্দরুল আলমঃ জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে যে অদৃশ্য ক্ষমতার জাল নিয়ে নানা গুঞ্জন ছিল, সেই জালের মাঝখানের মানুষ হিসেবে এবার সামনে আসছে রিভার অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজার (অপারেশন) সাঈদুল রহমানের নাম। তার শ্যালক আজিম উদ্দিন, যিনি নিষিদ্ধ সংগঠন সমুদ্র যুব ঐক্য পরিষদ–এর সভাপতি ছিলেন, বর্তমানে ভারতে পলাতক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—আজিম উদ্দিন দেশ ছাড়া হলেও তার “অর্থ আর প্রভাবের রুট” এখনও সক্রিয়, আর সেই রুটের বাংলাদেশ অংশ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছেন সাঈদুল।

রিভার অয়েলের পতেঙ্গা টার্মিনালকে বলা হয় দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জ্বালানি লোডিং-পয়েন্টগুলোর একটি। প্রতিদিন এখানে ৭,০০০–৮,২০০ মেট্রিক টন ডিজেল, অকটেন আর পেট্রল ওঠানামা করে। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে—এখানকার মাপে মাত্র ১% কম দেখালেই দিনে ৮–১০ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় ক্ষতি হয়। বছরজুড়ে সেই অঙ্ক দাঁড়ায় ৩,০০০ কোটি টাকার বেশি। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ তিন দশক ধরে একচ্ছত্রভাবে ধরে রেখেছেন সাঈদুল রহমান। ১৯৯৭ সালে স্থায়ী হওয়ার পর কাগজে কলমে তার বদলির আদেশ বহুবার হলেও, অফিসে সবাই বলে—“সাঈদুলের বদলি পাঁচ মিনিটও টেকে না।”

পতেঙ্গা টার্মিনালকে কেন্দ্র করে যে তেলচুরির সিন্ডিকেট সক্রিয়, তা ৮ ধাপে পরিচালিত হয়—এমন তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। ভুয়া লোডশিট বানানো, ট্যাংকারে গোপন চেম্বার রাখা, মিটার কম দেখানোর মাধ্যমে তেল লুকানো, ল্যাবে গ্রেড কম দেখিয়ে তেলের অংশ সরিয়ে ফেলা, রাতের শিফটে ট্যাংকারের গন্তব্য বদলানো, মাঝপথে আনলোড, পুলিশ ‘ম্যানেজ’, শেষে নথি সামঞ্জস্য করা—সব মিলিয়ে বিশাল এক নেটওয়ার্ক। আর এই পুরো অপারেশন পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন—ডিএম সাঈদুল। রিভার অয়েলের এক ডেপুটি কন্ট্রোলার পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন— “টার্মিনালে কোন লাইনের মিটার কখন নষ্ট হলো, কে নষ্ট করল, কেন করল—অন্যেরা জানুক বা না জানুক, সাঈদুল জানতেন।”

এত বড় নেটওয়ার্ক চালাতে মানুষের যোগ্যতার চেয়ে বেশি লাগে প্রভাব। আর সেই প্রভাবের পরিচয় মিলেছে সাঈদুল ও তার স্ত্রীর নামের ৭টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাওয়া ৪৮১ কোটি ৬০ লাখ টাকার রহস্যজনক লেনদেনে। সিটি ক্রেডিট ব্যাংকে ৮৭ কোটি, গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ ব্যাংকে ৬২ কোটি, ইস্ট ওয়েস্ট ট্রাস্টে ৫৫ কোটি, সাউথ এশিয়া ফিন্যান্সে ৭৬ কোটি, হিল ভিউ ব্যাংকে ৪৩ কোটি, সিকিউরিটি ট্রেড ব্যাংকে ৯৭ কোটি এবং ইউনিয়ন প্রাইম ব্যাংকে ৬১ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার—এই লেনদেনের ৬৫%ই ক্যাশ উত্তোলন, যা ব্যাংক আইনে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত হয়। আরও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৮ কোটি টাকা সিঙ্গাপুর হয়ে কানাডায় গেছে, তার ছেলে-মেয়েদের নামে।

সাঈদুলের নিয়ন্ত্রণ শুধু টার্মিনালেই নয়—তার শ্যালক আজিম উদ্দিনের লুকোনো বাহিনীকেও তিনি আশ্রয় দিচ্ছেন। কাসালগঞ্জের ৭৭৫/৮৮৫ নম্বরের “আরিজ হাউজ” নামের ভবনে অন্তত ৯ জন পলাতক কর্মী, ৩ জন অস্ত্রধারী এবং বিদেশফেরত আরও কয়েকজন সদস্যের অবস্থানের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফ্ল্যাট বরাদ্দ থেকে শুরু করে মাসে মাসে রহস্যজনক গাড়ি আসা–যাওয়া—সবই পরিচালনা করেন সাঈদুল। স্থানীয়রা জানান—“মাসে একবার দুটো গাড়ি আসে, ব্যাগ বদলায়। কেউ কিছু বলেনা।”

সরকারি চাকরিতে থাকা একজন মানুষের পক্ষে এত সম্পদ অর্জন কিভাবে সম্ভব—এটাই এখন বড় প্রশ্ন। কাসালগঞ্জে তার ৫ তলা বাড়ি ‘আরিজ হাউজ’-এর বাজারমূল্য ১০–১২ কোটি টাকা। পাশাপাশি ৮ শতাংশ জমিতে ১০ তলা ভবন নির্মাণাধীন, প্রকল্প মূল্য ৩০–৩৫ কোটি। গ্রামের পাঁচ ভাইয়ের জন্য আলাদা পাঁচটি বাড়ি—প্রায় ১৫ কোটি টাকার প্রকল্প। বিদেশে তিনটি ফ্ল্যাট—কানাডা, মালয়েশিয়া ও ভারতে—যার মূল্য ৫০–৬০ কোটি। গাড়ির বহর, অফিসিয়াল গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহারসহ মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮০–৫২০ কোটি টাকায়।

এত বড় কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পরও তিনটি সংস্থা—জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, রিভার পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)—চুপ করে আছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, দুদকের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে “লেনদেন” হয়ে গেছে। তদন্ত শুরুর চেষ্টা হলেই কিছু কর্মকর্তা তড়িঘড়ি করে বদলি করা হয়েছে। এক জ্যেষ্ঠ আমলা পর্যন্ত বলেছেন—“তিনটা সংস্থা নীরব মানেই বোঝা যায়, কেউ একজন খুব শক্তিশালী তাকে রক্ষা করছে।”

রিভার অয়েলের ভেতরে এখন আতঙ্ক আর নীরবতা। যে কথা বলবে, তার বদলির অর্ডার নাকি পরদিনই আসে। তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দুইবার দেওয়া হলেও “অজ্ঞাত কারণে” বাতিল হয়েছে। সেখানে কাজ করা কর্মকর্তাদের মতে—“এটা সরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবে এটি সাঈদুলের ব্যক্তিগত রাজ্য।”

হাজার হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ বছরের পর বছর অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেখলে মনে হয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভেতরে এমন একটি বলয় তৈরি হয়েছে যা সহজে ভাঙা সম্ভব হয়নি। তিন দশক ধরে একজন ব্যক্তি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়টিও ইঙ্গিত করে যে পুরনো রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনের ভেতরের যোগসাজশ এবং বিপুল অর্থের প্রভাব মিলেই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যার বাইরে রাষ্ট্র নিজেও কার্যত সীমাবদ্ধ।

ডিএম সাঈদুল রহমানকে ঘিরে অভিযোগ যতই জমতে থাকুক, তদন্ত এখনো শুরু হয়নি—এ বিষয়টি দেখায় যে জনগণের সম্পদের হিসাব আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব ও জবাবদিহিতে বড় ধরনের শূন্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

  • Related Posts

    গজারিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আখি সরকার: ক্ষমতা, প্রভাব আর বিতর্কের এক লুকানো অধ্যায়

    এসএম বদরুল আলমঃ গজারিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক খাদিজা আক্তার আখি সরকার আবারও আলোচনায়। নিষিদ্ধ ঘোষণা করা আওয়ামী লীগকে পুনরায় সুসংগঠিত…

    গণপূর্ত অধিদপ্তরে অস্থিরতা: প্রধান প্রকৌশলীর চারপাশে বাড়ছে চাপ, বদরুল আলমের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

    এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাম্প্রতিক সময়ে অস্বস্তি ও অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী নাকি ধীরে ধীরে আটকা পড়ছেন সাভার গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের কাজের ফেরার নির্দেশ, না মানলে ব্যবস্থা

    • By Reporter
    • ডিসেম্বর ৫, ২০২৫
    • 2 views
    মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের কাজের ফেরার নির্দেশ, না মানলে ব্যবস্থা

    ঢাকা-১৮ আসনে এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের মনোনয়ন পাওয়ায় অভিনন্দন জানালেন আজমুল হুদা মিঠু

    • By Reporter
    • ডিসেম্বর ৪, ২০২৫
    • 12 views
    ঢাকা-১৮ আসনে এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের মনোনয়ন পাওয়ায় অভিনন্দন জানালেন আজমুল হুদা মিঠু

    ঢাকা-১৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন মনোনয়ন পেলেন

    • By Reporter
    • ডিসেম্বর ৪, ২০২৫
    • 9 views
    ঢাকা-১৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন মনোনয়ন পেলেন

    গজারিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আখি সরকার: ক্ষমতা, প্রভাব আর বিতর্কের এক লুকানো অধ্যায়

    • By Reporter
    • ডিসেম্বর ৪, ২০২৫
    • 14 views
    গজারিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আখি সরকার: ক্ষমতা, প্রভাব আর বিতর্কের এক লুকানো অধ্যায়

    গণপূর্ত অধিদপ্তরে অস্থিরতা: প্রধান প্রকৌশলীর চারপাশে বাড়ছে চাপ, বদরুল আলমের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

    • By Reporter
    • ডিসেম্বর ৪, ২০২৫
    • 77 views
    গণপূর্ত অধিদপ্তরে অস্থিরতা: প্রধান প্রকৌশলীর চারপাশে বাড়ছে চাপ, বদরুল আলমের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

    রংপুরের শাহিনুল ইসলাম: গ্রামের কৃষকদের জন্য স্বপ্নের কৃষি উদ্যোগ

    • By Reporter
    • ডিসেম্বর ৪, ২০২৫
    • 7 views
    রংপুরের শাহিনুল ইসলাম: গ্রামের কৃষকদের জন্য স্বপ্নের কৃষি উদ্যোগ