বদলি ও নিয়োগে কোটি টাকার অভিযোগ: প্রশ্নের মুখে ওয়াসা প্রশাসন

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা ওয়াসার ভেতরে আবারও বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে আছেন সংস্থাটির উপ-সচিব (প্রশাসন-১) নুরুজ্জামান মিয়াজী। ওয়াসা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বদলি ও নিয়োগকে হাতিয়ার করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে তিনি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রভাব বিস্তার করতেন এবং নিজের অবস্থান শক্ত করতেন।

নুরুজ্জামান মিয়াজীর বিরুদ্ধে আগেও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। একসময় ঘুষ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে চাকরি থেকে বরখাস্তও হয়েছিলেন তিনি। তবে তখন তিনি নিজেকে ছাত্রলীগের নেতা ও কুমিল্লার বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের মাধ্যমে পুনরায় চাকরিতে ফিরে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই সময় থেকেই ওয়াসার ভেতরে তার প্রভাব বাড়তে থাকে বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ওয়াসায় শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ৬ ডিসেম্বর তাকে প্রশাসন বিভাগ-২ থেকে সরিয়ে শ্রম ও কল্যাণ বিভাগে বদলি করা হয়। এই বিভাগটি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ওয়াসার বিএনপিপন্থী কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আজিজুল আলম খান (অবসরপ্রাপ্ত) এবং সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন পাটোয়ারির সহযোগিতায় তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই আবার প্রশাসন-১ বিভাগে ফিরে আসেন।

পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসার পর নুরুজ্জামান মিয়াজী আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ। সেই সময় ওয়াসায় সচিব ও প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় পরিস্থিতির সুযোগ নেন তিনি। আউটসোর্সিং কর্মচারীদের বদলি এবং নতুন নিয়োগকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে ওঠে। এই চক্রের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনে ৩০ ডিসেম্বর দায়ের করা একটি অভিযোগে বলা হয়, সম্প্রতি প্রায় দুই শত আউটসোর্সিং কর্মচারীর বদলি এবং চল্লিশ জন বিলিং সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব প্রক্রিয়ার তালিকা তৈরি থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নুরুজ্জামান মিয়াজী, আজিজুল আলম খান এবং মনির হোসেন পাটোয়ারি সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নিয়োগ ও বদলির মাধ্যমে এক কোটিরও বেশি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

ওয়াসার ভেতরে কর্মচারী ও ঠিকাদারদের কাছে নুরুজ্জামান মিয়াজীকে ‘মূর্তিমান আতঙ্ক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয় অভিযোগপত্রে। বলা হয়েছে, তার সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ গেলে বদলি, হয়রানি কিংবা চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হতো। এমনকি তার নিজের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ পরীক্ষায় নবম স্থান অর্জন করলেও প্রায় ১৪ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে তিনি এই পদে আসীন হন।

এছাড়া ওয়াসার সাবেক এমডি তাকসিম এ খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেও নুরুজ্জামান মিয়াজীর নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তাকসিম এ খানের সময়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির মাধ্যমে যে দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে, তার অন্যতম সুবিধাভোগী ছিলেন তিনি। এই প্রক্রিয়ায় কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

অভিযোগে আরও বলা হয়, দুর্নীতির টাকায় নুরুজ্জামান মিয়াজী বর্তমানে প্লট, ফ্ল্যাট ও বাড়িসহ বিপুল সম্পদের মালিক। তার এসব সম্পদ ঘোষিত আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দুর্নীতি দমন কমিশন সঠিকভাবে তদন্ত করলে তার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণ পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। আওয়ামী লীগের শাসনামলে তিনি নিজেকে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা প্রচার করতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে নিয়মিত পোস্ট দিতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্যও তিনি দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নুরুজ্জামান মিয়াজী। তার দাবি, বদলি ও নিয়োগের বিষয়টি সত্য হলেও সংখ্যা কম। এসব সিদ্ধান্ত এমডির দপ্তর থেকে পাঠানো তালিকা অনুযায়ী হয়েছে, এতে তার ব্যক্তিগত কোনো ভূমিকা নেই। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করে বলেন, তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

এ বিষয়ে ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী শওকত মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

  • Related Posts

    জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য চুরি করে অনলাইন বাজারে বিক্রি, মাসে কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় পরিচয়পত্রের গোপন তথ্য হাতিয়ে নিয়ে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন চ্যানেলের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করার একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই চক্রের মাধ্যমে…

    পেনশনের ফাইল আটকে রেখে ঘুষ, বাঁশখালীতে পরিবার পরিকল্পনা অফিসের সহকারী আটক

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে পেনশনের কাগজপত্র নিয়ে ভয়াবহ অনিয়মের ঘটনা সামনে এসেছে। ওই কার্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অফিস সহায়ক আ ন ম মুদ্দাছেরুল হক পেনশনের টাকা তুলতে প্রয়োজনীয়…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    গণভোটের পক্ষে সরকারের প্রকাশ্য সমর্থন নিয়ে সমালোচনা, ব্যাখ্যা দিল প্রেস উইং

    • By Reporter
    • জানুয়ারি ১৮, ২০২৬
    • 3 views
    গণভোটের পক্ষে সরকারের প্রকাশ্য সমর্থন নিয়ে সমালোচনা, ব্যাখ্যা দিল প্রেস উইং

    যথেষ্ট সংস্কার হয়েছে: আসিফ নজরুল

    • By Reporter
    • জানুয়ারি ১৮, ২০২৬
    • 2 views
    যথেষ্ট সংস্কার হয়েছে: আসিফ নজরুল

    জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য চুরি করে অনলাইন বাজারে বিক্রি, মাসে কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা

    • By Reporter
    • জানুয়ারি ১৮, ২০২৬
    • 10 views
    জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য চুরি করে অনলাইন বাজারে বিক্রি, মাসে কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা

    পেনশনের ফাইল আটকে রেখে ঘুষ, বাঁশখালীতে পরিবার পরিকল্পনা অফিসের সহকারী আটক

    • By Reporter
    • জানুয়ারি ১৮, ২০২৬
    • 18 views
    পেনশনের ফাইল আটকে রেখে ঘুষ, বাঁশখালীতে পরিবার পরিকল্পনা অফিসের সহকারী আটক

    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ নিয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ, দুদকের অভিযান থামল নথি না পাওয়ায়

    • By Reporter
    • জানুয়ারি ১৮, ২০২৬
    • 33 views
    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ নিয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ, দুদকের অভিযান থামল নথি না পাওয়ায়

    গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের সঙ্গে তারেক রহমানের মতবিনিময়

    • By Reporter
    • জানুয়ারি ১৮, ২০২৬
    • 14 views
    গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের সঙ্গে তারেক রহমানের মতবিনিময়