বিশেষ প্রতিবেদকঃ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের ছত্রচ্ছায়ায় যখন প্রশাসনিক জবাবদিহি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তখন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের আড়ালে জন্ম নেয় ভয়ংকর মাফিয়া কাঠামো। নাহিদ গ্রুপকে ঘিরে এমনই একটি সংগঠিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব উঠে এসেছে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে, যার নেপথ্যে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রযন্ত্রকে কার্যত জিম্মি করে রেখেছে বলে অভিযোগ।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের মূল ছায়া-নিয়ন্ত্রক হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠ ঝন্টু কুমার সাহা। তার নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে অপারেশনাল ভূমিকা পালন করছেন তন্ময় দাস ও কিতাব আলী। প্রশাসন, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে তারা গড়ে তুলেছেন এমন এক দমনযন্ত্র, যার বিরুদ্ধে কথা বলাই হয়ে উঠেছে বিপজ্জনক।
কিতাব আলীকে এই নেটওয়ার্কের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ‘ম্যানেজার’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন একাধিক সূত্র। আনোয়ার হোসেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তি একটি ভ্যাট সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বে থাকলেও, অভিযোগ রয়েছে—তার অবস্থান ব্যবহার করে তিনি সিন্ডিকেটের অবৈধ কর্মকাণ্ডে প্রশাসনিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেন। কোনো অভিযোগ বা অনুসন্ধান শুরু হলেই তা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা কিংবা থামিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ—এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের।
এছাড়া কিতাব আলীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত জীবন ও অফিসিয়াল সুযোগ–সুবিধার অপব্যবহার সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ হিসেবে কিছু ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নির্দিষ্ট মহলে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেও নীরব অস্বস্তি বিরাজ করছে।
ঝন্টু কুমার সাহার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ সামনে এলেই তা ‘ম্যানেজ’ করার দায়িত্বে থাকতেন কিতাব আলী—এমন অভিযোগ উঠেছে বারবার। রাজনৈতিক মহলে অর্থ পৌঁছে দেওয়া, প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি এবং মামলার ফাইল স্থবির করে দেওয়ার মতো কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই এই সিন্ডিকেট একটি সংগঠিত ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এই চক্রের আর্থিক মেরুদণ্ড হিসেবে উঠে এসেছে তন্ময় দাসের নাম। স্থানীয়দের ভাষায়, ঝন্টু কুমার সাহার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী এবং সিন্ডিকেটের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকারী হলেন তন্ময় দাস। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তার নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ নিয়ে এলাকায় তীব্র প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, তন্ময় দাসের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা। কোনো দৃশ্যমান ও বৈধ পেশা ছাড়াই এত অল্প সময়ে এমন বিপুল সম্পদ অর্জন কীভাবে সম্ভব—সে প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা। অভিযোগ রয়েছে, নাহিদ গ্রুপের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং আওয়ামী ঘনিষ্ঠ কালো টাকা সাদা করার প্রক্রিয়াতেই এই সম্পদের উত্থান ঘটেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ঝন্টু কুমার সাহার সব ধরনের অনৈতিক আর্থিক লেনদেন, অপরাধমূলক যোগাযোগ এবং কালো টাকার হিসাবরক্ষণ সরাসরি তন্ময় দাসই পরিচালনা করতেন। এই অর্থনৈতিক শক্তির ওপর ভর করেই সিন্ডিকেটটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
ফ্যাসিবাদী দমননীতির পরিচিত কৌশল—মামলা দিয়ে কণ্ঠরোধ—এই সিন্ডিকেটের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলায় অন্তত ৫ থেকে ৬ জন ব্যক্তিকে টার্গেট করে তন্ময় দাসকে বাদী বানিয়ে ১৪ থেকে ১৫টি হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব মামলার পেছনে সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছেন ঝন্টু কুমার সাহা এবং কিতাব আলী। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে প্রতিবাদ ও সত্যের কণ্ঠ রুদ্ধ করা।
এই পরিস্থিতিতে জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির গল্প নয়; বরং আওয়ামী ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আইনের শাসনকে পরিকল্পিতভাবে ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
নাগরিকদের পক্ষ থেকে তন্ময় দাসের সম্পদের উৎস দুদকের মাধ্যমে তদন্ত, কিতাব আলীকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে আইনি পদক্ষেপ এবং সাজানো মামলাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। এক ভুক্তভোগীর ভাষায়, “ফ্যাসিবাদ যত শক্তিশালীই হোক, সত্য একদিন প্রকাশ হবেই। এই চক্রের বিচার বাংলার মাটিতেই হবে।”
সবশেষে বলা যায়, নাহিদ গ্রুপের নাম ব্যবহার করে গড়ে ওঠা এই আওয়ামী ফ্যাসিবাদী মাফিয়া সিন্ডিকেট এখন রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়ের জন্যই হুমকি। আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে ঝন্টু কুমার সাহা, তন্ময় দাস ও কিতাব আলীর কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের কোনো বিকল্প নেই।











