এসএম বদরুল আলমঃ রাজধানীর আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগকে ঘিরে নতুন করে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি, এখানে এখন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সিন্ডিকেটের মূল ব্যক্তি হিসেবে তারা নাম বলছেন বহিরাগত বদিউল আলম সুইটের। তিনি নিজেকে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী হিসেবে পরিচয় দেন এবং তার প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডার বাণিজ্যে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে সুইট একটি প্রভাবশালী চক্র তৈরি করেছেন। এই চক্রের মাধ্যমে কোটি টাকার কাজ ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়, যেখানে স্বচ্ছতা বা সরকারি নিয়মকানুন মানা হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, কোনো ঠিকাদার কাজ পেতে চাইলে তাকে আগে থেকেই মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়। বিশেষ করে এলটিএম পদ্ধতিতে কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে প্রাক্কলিত মূল্যের প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম কমিশন দাবি করা হয়। এই টাকা না দিলে টেন্ডার বাতিল করে দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া টেন্ডার বণ্টনের ক্ষেত্রে ‘লটারি’ নামের একটি প্রক্রিয়া দেখানো হলেও বাস্তবে তা আগেই ঠিক করা থাকে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। সুইট ও তার সহযোগীরা নিজেদের পছন্দের কিছু ঠিকাদারের তালিকা তৈরি করেন এবং পরে সেই তালিকা অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দেন। ফলে সাধারণ ঠিকাদাররা কোনোভাবেই ন্যায্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারছেন না।
অভিযোগ আরও গুরুতর হয়েছে যখন বলা হয়েছে, সুইটের অনুমতি ছাড়া কেউ টেন্ডার জমা দিতেই পারে না। তার ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া কোনো কাজের সুযোগ নেই। কেউ এই নিয়ম না মানলে তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়—কখনো কাজের সাইটে বাধা দেওয়া হয়, কখনো প্রশাসনিক জটিলতায় ফেলে দেওয়া হয়, আবার কখনো সরাসরি ভয়ভীতি দেখানো হয়।
একজন ভুক্তভোগী ঠিকাদার লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন, তার লাইসেন্স ব্যবহার করে সুইট ঠিকাদার সমিতির নেতা হয়েছেন এবং সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে তার কাছ থেকে জোর করে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত টাকা আদায় করেছেন। এই ধরনের চাঁদাবাজির ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
এদিকে কেউ যদি এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খোলার চেষ্টা করেন, তাহলে তাকে ‘ব্ল্যাকলিস্টে’ ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। অডিট, নিয়মভঙ্গ বা প্রশাসনিক ঝামেলার ভয় দেখিয়ে তাদের চুপ করিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে অনেকেই ভয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস পাচ্ছেন না।
একাধিক ঠিকাদারের মতে, বর্তমানে আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগে এক ধরনের দ্বৈত ক্ষমতা চলছে। অফিসের ভেতরে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও, বাইরে বদিউল আলম সুইটের প্রভাবই বেশি কার্যকর। এই দুইয়ের চাপে সাধারণ ঠিকাদাররা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছেন। তাদের কথায়, নিয়ম মেনে চললে কাজ পাওয়া যায় না, আর সিন্ডিকেটের বাইরে থাকলে টিকে থাকাই কঠিন।
এই পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ ঠিকাদাররা বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে জানিয়েছে এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি তুলেছেন। তারা চাইছেন, বদিউল আলম সুইটের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ইতোমধ্যে অভিযোগের কপি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সচিবসহ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু একটি অফিসের সমস্যা নয়—বরং পুরো সরকারি টেন্ডার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দেয়। এখন সবার নজর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দিকে—তারা এই অভিযোগগুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখবে এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেয় কি না।









