বিশেষ প্রতিবেদকঃ দেশে সরকার পরিবর্তনের পর জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও প্রশাসনিক দুর্নীতি বন্ধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই হতাশাজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ঔষধ খাতে অনিয়ম ও ভেজাল কারবার বন্ধে যে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছিল, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠছে। এমন প্রেক্ষাপটে আই,কে আয়ুর্বেদিক ঔষধালয় লিমিটেড ও আই,কে ল্যাবরেটরীজ (ইউনানি) নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ নতুন করে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, আই,কে আয়ুর্বেদিক ঔষধালয় লিমিটেড (উৎপাদন লাইসেন্স নং আয়ু-০৮৬, ঢাকা) এবং আই,কে ল্যাবরেটরীজ (ইউনানি) (উৎপাদন লাইসেন্স নং ২৯৮, ঢাকা) বাংলাদেশ জাতীয় আয়ুর্বেদিক ফর্মুলারী ও জাতীয় ইউনানি ফর্মুলারী অনুসরণ না করেই দীর্ঘদিন ধরে ঔষধ তৈরি ও বাজারজাত করে আসছে। বলা হচ্ছে, অনুমোদিত ফর্মুলা উপেক্ষা করে নিজেদের মতো করে রং, ফ্লেভার ও বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশিয়ে এসব ঔষধ প্রস্তুত করা হচ্ছে, যা সরাসরি আইন লঙ্ঘনের শামিল।
অভিযোগে আরও বলা হয়, এসব ঔষধ দেখতে আকর্ষণীয় করতে চটকদার নাম, লেবেল ও মোড়ক ব্যবহার করা হলেও গুণগত মান ও নিরাপত্তার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ভয়াবহ বিষয় হলো—এই পুরো প্রক্রিয়ায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নথি ব্যবস্থাপনা ও তদারকির দায়িত্বে থেকেও চোখ বন্ধ করে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তালিকায় একজন পরিচালক, উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক, ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক, উচ্চমান সহকারী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম জড়িত থাকার কথা বলা হচ্ছে।
আই,কে আয়ুর্বেদিক ঔষধালয় লিমিটেডের যেসব পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কামিনী বিদ্রাবণ রস (হালওয়া), শুক্রসুধা (হালওয়া), বৃহৎচন্দ্রোদয় মকরধ্বজ ট্যাবলেট, আইকে আমলকি রসায়ন, আইকে দশমূলারিস্ট, আইকে রোজ ভিট, সরবত তুলসী, আইকে গোল্ড ট্যাবলেট এবং আইকে অর্জুনারিস্ট সিরাপ। অন্যদিকে আই,কে ল্যাবরেটরীজ (ইউনানি)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা পণ্যের মধ্যে রয়েছে আরক ডাইকোপ্লেক্স (ফওলাদ সাইয়াল), আরক ডাইকোপ্লেক্স গোল্ড (ফওলাদ সাইয়াল) সিরাপ, নাইট্রিন (জিরিয়ানী), কার্ডিফেক্স সিরাপ, আইকে ভিট সিরাপ, আইকে জিনসিন (শরবত জিনসিন) এবং বাসক সিরাপ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো, আইকে জিনসিন (শরবত জিনসিন) সিরাপে যৌন উত্তেজক ওষুধ ভায়াগ্রার উপাদান হিসেবে পরিচিত সিলডেনাফিল সাইট্রেট ব্যবহার করা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে আইকে আয়ুর্বেদিক ঔষধালয় লিমিটেডের শুক্রসুধা ও কামিনী বিদ্রাবণ রস নিয়েও। এসব আয়ুর্বেদ ও ইউনানি ঔষধে এমন কেমিক্যাল ব্যবহারের বিষয়টি প্রমাণিত হলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া আইকে ভিট সিরাপে গবাদি পশু মোটা-তাজাকরণে ব্যবহৃত কেমিক্যাল ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে, যা মানুষের শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঔষধ খেলে তাৎক্ষণিকভাবে শরীরে উত্তেজনা বা শক্তি অনুভূত হলেও দীর্ঘমেয়াদে যৌন ক্ষমতা নষ্ট হওয়া, হরমোনজনিত সমস্যা, লিভার ও কিডনি বিকল হওয়া এবং হৃদযন্ত্রের জটিলতা দেখা দিতে পারে। এমনকি এসব কেমিক্যাল নিয়মিত গ্রহণে ধীরে ধীরে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আরও উদ্বেগজনক দিক হলো—এই তথাকথিত শক্তিবর্ধক ও যৌন উত্তেজক ঔষধের সহজলভ্যতার কারণে স্কুল ও কলেজপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীরাও এসবের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক অশান্তি ও দাম্পত্য জীবনে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব অভিযোগের পরও এখন পর্যন্ত আই,কে আয়ুর্বেদিক ঔষধালয় লিমিটেড ও আই,কে ল্যাবরেটরীজ (ইউনানি)-এর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু কর্মকর্তা আর্থিক ও অন্যান্য অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে এসব প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন ধরে রক্ষা করে আসছেন। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে ভেজাল ও ঝুঁকিপূর্ণ ঔষধ সেবন করছে, যার দায় শেষ পর্যন্ত কেউ নিচ্ছে না।
জনস্বার্থে সচেতন নাগরিক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন দ্রুত স্বাধীন তদন্ত, দোষীদের শনাক্তকরণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রশ্ন—জনস্বাস্থ্য নিয়ে এই প্রকাশ্য ছিনিমিনি আর কতদিন চলবে, আর ভেজাল ঔষধে প্রাণহানির দায় শেষ পর্যন্ত কার কাঁধে পড়বে?










