এসএম বদরুল আলমঃ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড এবং ডেমরার বিগো ফার্মাসিউটিক্যাল আয়ুর্বেদিক নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস ময়মনসিংহের ঠিকানায় লাইসেন্স নিলেও তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ঢাকাকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। লাইসেন্সে ‘ল্যাবরেটরি’ নাম থাকলেও বাজারে ভিন্ন নামে পণ্য ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো—আয়ুর্বেদিক বা ইউনানি সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকার কথা থাকলেও “ফার্মাসিউটিক্যালস” শব্দ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের আধুনিক ওষুধ প্রস্তুতকারক হিসেবে উপস্থাপন করছে বলে অভিযোগ।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি এসেছে তাদের পণ্যের গুণগত মান নিয়ে। তাদের প্রধান ব্যবসার পণ্যের মধ্যে অনুমোদিত ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ওষুধ ‘ডায়কেয়ার’, যৌনশক্তিবর্ধক হিসেবে প্রচারিত ‘নাইটেক্স’ ও ‘রিস্টোর’ উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, ভেষজ উপাদানের কথা বলে প্রচার করা হলেও বাস্তবে কিছু পণ্যে রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও যৌনশক্তি বৃদ্ধির নামে বাজারজাত কিছু পণ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—এসব পণ্যের কার্যকারিতা নিয়ে কোনো স্বচ্ছ তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব পণ্যের অনেকগুলোই অনুমোদিত তালিকায় নেই এবং আয়ুর্বেদিক বা ভেষজ হিসেবে প্রচার করা হলেও বাস্তবে সেগুলোতে রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে আবু বক্করের নাম উঠে এসেছে অভিযোগে। অভিযোগকারীদের দাবি, একটি বড় মার্কেটিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সারাদেশে শোরুম এবং কমিশনভিত্তিক বিক্রয় পদ্ধতিতে এসব পণ্য বিপণন করা হচ্ছে। কিছু অভিযোগে এটিও বলা হয়েছে, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, “ডায়াবেটিস নিরাময়” বা “ইনসুলিন স্বাভাবিকভাবে তৈরি হবে”—এ ধরনের দাবি দিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং যথাযথ গবেষণা ছাড়া এমন প্রচারণা বিভ্রান্তিকর।
অন্যদিকে, রাজধানীর ডেমরার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭০নং ওয়ার্ডের মেন্দিপুর এলাকায় বিগো ফার্মাসিউটিক্যাল আয়ুর্বেদিক কারখানায় অবৈধভাবে যৌন উত্তেজক সিরাপ তৈরি হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। যার স্বত্বাধিকারী মো. শাখাওয়াত হোসেন।
স্থানীয়রা জানায়, তিন তলা ভবন বিশিষ্ট এ কারখানাটি চারদিকে দেয়াল দিয়ে আটকানো এবং যেখানে মূল গেট সেটা দিনরাত সব সময় বন্ধ থাকে। আমাদের এলাকার একটি প্রতিষ্ঠান এখানে আমাদের এলাকার ছেলে মেয়েরা চাকরি করতেন৷ তবে তাদের দিয়ে তৈরি করে নেওয়া হয় যৌন উত্তেজক সিরাপ ও ক্যাপসুল। এসব কারণে অনেকেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানায়, বিগো ফার্মাসিউটিক্যাল নামের এই আয়ুর্বেদিক কোম্পানিতে অভিযান পরিচালনা করেও কোনো লাভ নেই, এটা কেউ বন্ধ করতে পারবে না। কারণ এরা ওপর লেভেলের সকলকে ম্যানেজ করেই অবৈধ কার্যকলাপ করে থাকে।

স্থানীয় রিপন নামে একজন বলেন, ‘এখানে যে সব যৌন উত্তেজক সিরাপ তৈরি করা হয়, তার কোনো অনুমোদন নেই৷ আমি এক জনের মাধ্যমে কোম্পানির মধ্য বেড়াতে গিয়ে দেখি সেখানে প্রচুর পরিমাণে অবৈধ যৌন উত্তেজক সিরাপ।’
রানা হোসেন নামে একজন বলেন, ‘এখানে যৌন উত্তেজক সিরাপ তৈরি করা হয়৷ আমি এই কোম্পানিতে চাকরি করতাম। আমি খেয়াল করেছি মাঝে মাঝে যখন সাংবাদিক আসতো তখন আমাদের বলা হতো গেট খোলা যাবে না। কোনো সাংবাদিককে গেটে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। বিভিন্ন সময় অভিযান হয় একারণে ভয়েই আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি।’
এ বিষয়ে বিগো ফার্মাসিউটিক্যাল আয়ুর্বেদিক কোম্পানির মালিক শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমার এখানে কোনো যৌন উত্তেজক সিরাপ তৈরি করা হয় না। যা যা তৈরি করা হয় তা নিয়ম মেনেই তৈরি করা হয়।’
এ বিষয়টি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক বলেন, ‘আপনারা এই বিষয় অবগত করেছেন। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। যদি সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
আরগন ফার্মাসিউটিক্যালসকে ঘিরে আরও অভিযোগ— কোম্পানিটি ডেসটিনির মতন করে ডায়াবেটিস সহ বিভিন্ন রোগের নাম বলে সাধারন মানুষকে বোকা বানিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এদিকে কোম্পানির মালিক আবু বক্কর আমেরিকায় ফ্যামিলি সহ থাকেন। সেখানে বসে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে আমেরিকায় বসে আরামের জীবন কাটাচ্ছেন। ওষুধ প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কোম্পানিদের অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে বলে একাধিক ভুক্তভোগীরা জানিয়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবু বক্করের শাশুড়ির প্রভাব খাটিয়ে নানা কর্মকান্ড চালিয়ে ছিল। সে নিজেও আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা এবং বিভিন্ন কর্মকান্ডে ফান্ডিং করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একটি শক্তিশালী মার্কেটিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সারাদেশে পণ্য ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে কমিশনভিত্তিক বিক্রয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। তাদের ভাষ্যমতে, বিভিন্ন রোগের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করা হচ্ছে এবং চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে এসব পণ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।
এদিকে, অভিযোগ রয়েছে—প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। যদিও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হবে এবং সত্যতা মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের আগে অবশ্যই তার অনুমোদন, বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এবং নিবন্ধন যাচাই করা জরুরি। অন্যথায় এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত পণ্য ব্যবহার মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে বার বার কল করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেন নি।








