বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ওষুধ পাইকারি বাজার মিটফোর্ডকে ঘিরে অবৈধ ওষুধ মজুদ, গোপন উৎপাদন এবং দেশব্যাপী সরবরাহের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বিভিন্ন মেডিসিন মার্কেটকে কেন্দ্র করে সংগঠিতভাবে এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অভিযোগে যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে শওকত আলী মেডিসিন মার্কেটের ২য় তলায় অবস্থিত রহিম ড্রাগ হাউস ও শাহিদা ড্রাগ হাউস, একই মার্কেটের নিচতলার দেবস্মিতা ড্রাগ হাউস। আলিফ লাম মিম মেডিসিন মার্কেটে উত্তরা ব্যাংকের পাশে অবস্থিত বেপারী ড্রাগ হাউস, বিসমিল্লাহ ড্রাগ হাউস ও রনি ড্রাগ হাউসের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া আমির মেডিসিন মার্কেটের ২য় তলার ত্রিরত্ন ড্রাগ হাউস এবং ভুঁইয়া মেডিসিন মার্কেটের নিচতলার রিপন ড্রাগ হাউসের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে অবৈধ ওষুধ বাজারজাত করা হচ্ছে।
এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে মোহাম্মদ দিদার নাম উঠে এসেছে, যাকে অভিযোগকারীরা ‘গডফাদার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জানা গেছে, এক-দুই বছর আগেও তিনি ইসলামপুর রোডের খান মার্কেটের নিচতলায় অবস্থিত “ইছামতি ড্রাগ হাউস”-এ কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে একই মার্কেটের তৃতীয় তলায় “নাসিমা ফার্মা” নামে একটি অফিস পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার সঙ্গে সাদিক সৈকতসহ আরও কয়েকজন অংশীদার জড়িত থাকার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, কিছু কোম্পানি থেকে বৈধভাবে পণ্য ক্রয় করে সেসবের জনপ্রিয় ও চলতি পণ্য আলাদা করে গোপনে পুনরুৎপাদন করিয়ে বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে।
অভিযোগ আরও বিস্তৃত হয়ে গাজীপুরের একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানার দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে গোপনে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার দাবি করা হয়েছে। উৎপাদিত পণ্য মিটফোর্ডসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ। পাশাপাশি উত্তরা সেক্টর-৬-এর একটি বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ডে বিপুল পরিমাণ ওষুধ মজুদের কথাও উল্লেখ রয়েছে, যেখান থেকে ধাপে ধাপে বিভিন্ন পাইকারি বাজারে সরবরাহ করা হয় বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় প্রশাসন ও কিছু সংগঠনের সঙ্গে সখ্যতা বজায় রেখে নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। অতীতে কয়েকটি দোকানে অভিযান পরিচালিত হলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া, প্রাইভেট গাড়ি ব্যবহার এবং বড় ফ্ল্যাট ক্রয়ের মতো বিষয়গুলোর আর্থিক উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। প্রায় ১০০ কোটি টাকার একটি সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ আনা হলেও এর স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমোদনহীন বা নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাত হলে তা সরাসরি রোগীর জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। এতে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বাড়তে পারে, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারে। ওষুধ খাতে অনিয়ম কেবল আর্থিক অপরাধ নয়—এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে জনস্বার্থে বিষয়টি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, ন্যায্য ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং বাজারে ভেজাল বা অবৈধ ওষুধ প্রতিরোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।










