এসএম বদরুল আলমঃ রাজধানীর মালিবাগে অবস্থিত রাজউকের অফিসার্স কোয়ার্টার এখন যেন বসবাসের অযোগ্য এক পরিবেশে পরিণত হয়েছে। যেখানে উন্নয়ন আর নিরাপদ বসবাসের কথা, সেখানে দেখা যাচ্ছে ময়লা পানি, অপরিচ্ছন্নতা, মশার উপদ্রব এবং নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড। দীর্ঘদিন ধরে এই কোয়ার্টারে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের।
অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) এবং বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা মো. আবু সাইদের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেট উন্নয়নের নামে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ পেলেও বাস্তবে কাজ হয় খুবই নিম্নমানের। একই কাজ বারবার দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও কোয়ার্টারের বাস্তব চিত্র বদলায়নি।
কোয়ার্টারের বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা নোংরা পানি থেকে মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। এতে ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ইতিমধ্যে এখানে বসবাসকারী বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। অথচ এই সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্টদের কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
অভিযোগ আছে, দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী প্রকৌশলী মিজান ও আমিনুল বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে এড়িয়ে যাচ্ছেন। বাসিন্দারা বারবার অভিযোগ করলেও তারা নানা অজুহাতে সময় পার করছেন। ফলে বাসিন্দারা ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, কলেরা ও টাইফয়েডের মতো রোগের ঝুঁকিতে বসবাস করছেন।
এদিকে কোয়ার্টারের ভেতরেই গড়ে উঠেছে মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক। পাম্পচালক সুমনের নেতৃত্বে ইয়াবা, ফেন্সিডিল ও মদের ব্যবসা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হিসেবে অফিস সহকারী ইউসুফ, ড্রাইভার ইলিয়াছ, আসাদুল, মেকানিক আবুল কাশেম ওরফে জামাই কাশেম এবং জাহেদ ইবনে নোমান (জুয়েল)-এর নাম উঠে এসেছে। এর আগে সুমন মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে মামলাও চলমান রয়েছে।
শুধু মাদকই নয়, কোয়ার্টারের ড্রাইভারদের ডরমেটরিতে নিয়মিত জুয়ার আসর বসছে। আবুল কাশেম ও ইলিয়াছের নেতৃত্বে এই জুয়ার বোর্ড পরিচালিত হয়। রাতের বেলায় সেখানে বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়ে যায় এবং মাদক সেবনও চলে। আগে পার্কিং এলাকায় এসব কার্যক্রম হলেও এখন ডরমেটরির ভেতরেই তা চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, করোনাকালীন সময়েও কোয়ার্টারের একটি ভবনের লোহার ফ্রেম কেটে বিক্রি করে দেওয়া হয়, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ টন। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের কারণে বিষয়টি চাপা পড়ে যায়।
বর্তমানে কোয়ার্টারের অনেক রুম অবৈধভাবে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। ড্রাইভার ইলিয়াছ, জুয়েল, খুরশীদ আলম (মিলন), ফারুকসহ অনেকেই একাধিক রুম ভাড়া দিয়েছেন। এসব রুমে বিভিন্ন পেশার লোকজন বসবাস করছেন, যাদের অনেকেই বহিরাগত। এর মাধ্যমে মাসে বড় অঙ্কের অর্থ আয় হচ্ছে, যার একটি অংশ নাকি দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তার কাছেও যায়।
এছাড়া এখানে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতও বেড়েছে। জুয়েলের ছেলে আইজান, জাকিরের ছেলে শুভসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই গ্যাং কোয়ার্টারের পরিবেশ নষ্ট করছে। তারা নিয়মিত আড্ডা, ইভটিজিং এবং মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, কিছু বাসায় অতিরিক্ত লোক সাবলেট হিসেবে রাখা হচ্ছে। যেমন ডিডি আসমা বেগমের বাসায় প্রায় ২০ জনের মতো মানুষ থাকেন। তার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে নানা অনিয়ম করার অভিযোগও উঠেছে।
সব মিলিয়ে, যেখানে রাজউকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার কর্মকর্তাদের জন্য নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ থাকার কথা, সেখানে এখন চলছে দুর্নীতি, মাদক ব্যবসা, জুয়া এবং অব্যবস্থাপনা। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে।
সচেতন মহলের দাবি, এই কোয়ার্টারের সব অনিয়ম তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। পাশাপাশি অবৈধ দখল, মাদক ব্যবসা ও জুয়ার আসর বন্ধ করে কোয়ার্টারের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।









