এসএম বদরুল আলমঃ দেশে হুইলচেয়ার, কমোড চেয়ার, হাঁটার লাঠি ও বিভিন্ন পোর্টেবল চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে সরকার বড় ধরনের শুল্ক ছাড় দেয়। এসব পণ্য জরুরি চিকিৎসা সহায়ক সামগ্রী হওয়ায় আমদানির সময় ব্যবসায়ীদের কোনো শুল্ক বা কর দিতে হয় না। তবে নিয়ম অনুযায়ী, এসব পণ্য দেশে বিক্রি করার সময় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) দিতে হয়। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, অনেক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সেই ভ্যাট না দিয়েই বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার জন্য ‘শূন্য ভ্যাট রিটার্ন’ বা ‘নিল রিটার্ন’ নামে একটি কৌশল ব্যবহার করছে। অর্থাৎ তারা প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমা দিলেও সেখানে দেখাচ্ছে যে তাদের কোনো ভ্যাটযোগ্য বিক্রি হয়নি। বাস্তবে তারা নিয়মিত পণ্য বিক্রি করলেও কাগজে–কলমে বিক্রির তথ্য গোপন রেখে সরকারের কাছ থেকে ভ্যাট লুকিয়ে রাখছে।
২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের আমদানি ও বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত কর্মকর্তারা এই অনিয়মের বড় চিত্র খুঁজে পেয়েছেন। তাদের অনুসন্ধানে হুইলচেয়ার ও চিকিৎসা সহায়ক সরঞ্জাম আমদানির সঙ্গে জড়িত মোট ৯৫৩টি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই নিয়মিত শূন্য রিটার্ন জমা দিয়েছে, যদিও বাস্তবে তারা বাজারে এসব পণ্য বিক্রি করেছে।
প্রাথমিক তদন্তে ইতোমধ্যে ২১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ভ্যাট ফাঁকির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো গত পাঁচ বছরে মোট ৫৫ কোটি ১৭ লাখ টাকার বেশি ভ্যাট পরিশোধ করেনি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই টাকার ওপর সুদ ও জরিমানা যোগ হলে প্রকৃত অঙ্ক কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে এবং তা শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ট্রেড ভিশন লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৭ কোটি ৮১ লাখ ৭৮ হাজার ১৯৬ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এরপর রয়েছে ইউনিমিড লিমিটেড, যাদের বিরুদ্ধে ১৪ কোটি ৪৮ লাখ ৮৭ হাজার ৬১৮ টাকা ভ্যাট না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাজ ট্রেডার্স প্রাইভেট লিমিটেড প্রায় ৫ কোটি ১৯ লাখ ৫৩ হাজার ৮২২ টাকা, এসএস এন্টারপ্রাইজ প্রায় ৩ কোটি ৭৩ লাখ ৩০ হাজার ৬৪২ টাকা এবং মেডিকিট ইন্টারন্যাশনাল প্রায় ২ কোটি ৭২ লাখ ২৬ হাজার ৩০৯ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলে তদন্তে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া রুশদা এন্টারপ্রাইজ প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ ৭৭ হাজার ৪৪১ টাকা এবং ইউনাইটেড সার্জিক্যাল লিমিটেড প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ ৯৫ হাজার ৬২৭ টাকার ভ্যাট পরিশোধ করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। একই তালিকায় আরও রয়েছে বিপরা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল (৮১ লাখ ৭৬ হাজার ৮০২ টাকা), ইউরো মিলেনিয়াম ট্রেডিং (৯৪ লাখ ৫ হাজার ৩৬৩ টাকা), দেশ মিডিকা (৯১ লাখ ১১ হাজার ৬৪৯ টাকা), ইয়ামিন টেক ইন্টারন্যাশনাল (৮৩ লাখ ৫২ হাজার ৬৪৩ টাকা), মেহেদী সার্জিক্যাল স্টোর (৫৮ লাখ ২৭ হাজার ৮৬১ টাকা), সুপার হেলথ কেয়ার (৫৬ লাখ ২৯ হাজার ৫৯৭ টাকা), স্ট্যান্ডার্ড মেডিকেল সিস্টেম (৫৬ লাখ ৯৮ হাজার ৪৬৫ টাকা) এবং ম্যাক্সটন এলাইন্স (৫৩ লাখ ৮ হাজার ৫০১ টাকা)।
তালিকায় থাকা আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও উল্লেখযোগ্য ভ্যাট ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে মেসার্স ট্রেড ফেয়ার, সাজ্জাদ ইনট্রাস্ট ট্রেড, নুসাইবা ট্রেডিং, বায়োটেক সার্ভিসেস, মেডিকম এবং মন্ডল সার্জিক্যাল অ্যান্ড ট্রেডিং। এসব প্রতিষ্ঠান কয়েক লাখ থেকে কয়েক দশ লাখ টাকা পর্যন্ত ভ্যাট পরিশোধ না করে বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে গেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, দেশে ব্যবহৃত অধিকাংশ হুইলচেয়ার, হাঁটার লাঠি ও পোর্টেবল কমোড চেয়ার বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এসব পণ্য আমদানিকারকরা পরে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বাজারে বিক্রি করেন। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান বিক্রির প্রকৃত তথ্য গোপন করে ভ্যাট রিটার্নে শূন্য দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।
ইতোমধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের কাছ থেকে বকেয়া ভ্যাট আদায়ের জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে জনবল সংকট ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাকি ৯৩২টি প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত তদন্ত এখনো সম্পূর্ণ করা যায়নি। এজন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১২টি ভ্যাট কমিশনারেটকে এসব প্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্র যাচাই করে ভ্যাট ফাঁকির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ এবং বকেয়া রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, সব প্রতিষ্ঠানের হিসাব যাচাই শেষ হলে এই খাতে মোট ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ প্রায় এক হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। যদি গুরুতর অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন বা বিআইএন স্থগিত কিংবা বাতিল করা হতে পারে। পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও করা হতে পারে, যেখানে কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
ভ্যাট আইন অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ভ্যাট ফাঁকি দেয়, তাহলে প্রথমে সেই বকেয়া কর আদায় করা হয়। এরপর অতিরিক্ত জরিমানা আরোপ করা হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে ফাঁকি দেওয়া টাকার সমপরিমাণ বা তারও বেশি হতে পারে। এছাড়া ওই টাকার ওপর সুদও যোগ করা হয়। গুরুতর অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ করা, নথিপত্র জব্দ করা বা আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানার শাস্তিও দেওয়া হতে পারে।
তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, ‘শূন্য ভ্যাট রিটার্ন’ দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার এই কৌশল দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। সাম্প্রতিক তদন্তে বিষয়টি বড় আকারে সামনে এসেছে এবং ধীরে ধীরে আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম প্রকাশ পেতে পারে।









