দুর্নীতির অভিযোগের মাঝেই বালিশকান্ডের অন্যতম হোতা আশরাফুল ইসলামক ই/এম সার্কেল–২ এ পদায়ন

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। এই প্রতিষ্ঠানে অনেক সৎ, মেধাবী ও দক্ষ প্রকৌশলী কাজ করছেন। তবে কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কারণে পুরো দপ্তরের সুনাম আজ প্রশ্নের মুখে। সেই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেক্ট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল বিভাগের প্রকৌশলী ডক্টর আশরাফুল ইসলাম।

অভিযোগ রয়েছে, ডক্টর আশরাফুল ইসলাম প্রায় আট বছর ধরে ঢাকায় একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল আছেন, যা সরকারি বদলি নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। নিয়ম অনুযায়ী কোনো নির্বাহী প্রকৌশলীর তিন বছরের বেশি একই কর্মস্থলে থাকার কথা নয়। ২০২১ সালের ৫ আগস্ট গণপূর্ত উপদেষ্টার দপ্তর থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকা প্রকৌশলীদের বদলি করতে হবে, যাতে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ কমে। কিন্তু সেই নির্দেশ আশরাফুল ইসলামের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বরং অভিযোগ আছে, নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা আলোচনায় থাকার পরও ২০২৩ সালের ১২ আগস্ট তাকে ভূতাপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এই প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব তাসমিন ফারহানা। পরে ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) হিসেবে গণপূর্ত ই/এম সার্কেল–২ এ পদায়ন করা হয়। নির্বাচন কমিশনের সম্মতি নিয়ে এই পদায়ন হওয়ায় দপ্তরের ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা আরও বেড়ে যায়।যার স্বারক নং ২৫.০০.০০০০.১৩০.১২.০০৩.১৮.১০৮, তারিখ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫। এদিকে ১৫ জানুয়ারি উক্ত দুর্নীতিবাজ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিপ্রাপ্ত) ডক্টর আশরাফুল ইসলামকে তত্ত্বাধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-২ এ পদায়ন করা হয়েছে। যার স্মারক নং ২৫.০০.০০০০.১৩০.১২.০০৩.১৮-০৬, তারিখ: ১৫/০১/২০২৬ ইং। নির্বাচন কমিশনের সম্মতি নিয়ে উপরোক্ত দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী ডক্টর আশরাফুল ইসলামের পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। যা নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে চলছে ব্যাপক আলোচনা। নানামুখী প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, আশরাফুল ইসলামের অধীনে কাজ করতে গেলে নিয়মের চেয়ে ‘ম্যানেজমেন্ট’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। অভিযোগ আছে, অনেক ক্ষেত্রে দরপত্র ছাড়াই কাজ শুরু করা হয়, পরে কাগজে-কলমে প্রাক্কলন ও টেন্ডার দেখানো হয়। ঠিকাদারদের নিয়ে একটি শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তুলে কমিশন আদায়ের ব্যবস্থাও চালু ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে আলোচিত দুর্নীতির ঘটনায় ডক্টর আশরাফুল ইসলামের নাম জড়িত ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। তিনি দুদকের একটি মামলার আসামি ছিলেন বলে জানা যায়। একই ঘটনায় অন্য কর্মকর্তারা শাস্তির মুখে পড়লেও রহস্যজনকভাবে তিনি বিভাগীয় ও দুদকের মামলায় অব্যাহতি পান। ওই ঘটনায় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জিল্লুর রহমান পদাবনতি পেলেও আশরাফুল ইসলাম বহাল থাকেন, যা বৈষম্যের অভিযোগকে আরও জোরালো করে।

এছাড়া তৎকালীন গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মেরামত ও সংস্কার কাজ দীর্ঘদিন তার অধীনে থাকায় তিনি দপ্তরের ভেতরে এক ধরনের অদৃশ্য প্রভাব তৈরি করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে একটি শক্তিশালী দুর্নীতিচক্র গড়ে উঠেছে বলে তারা মনে করছেন।

সোহবানবাগ মসজিদ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে সিভিল বিভাগের এক নির্বাহী প্রকৌশলীকে বদলি করা হলেও একই প্রকল্পে যুক্ত থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আশরাফুল ইসলামকে বহাল রাখা হয়। অনেকের মতে, আঞ্চলিক কোটা, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ের কারণেই তিনি বারবার বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন।

গণপূর্তের এক জুনিয়র প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দপ্তরে টিকে থাকতে হলে কেবল নিয়ম মানলেই হয় না, অন্য পথও জানতে হয়। তার ভাষায়, আশরাফুল ইসলাম সবাইকে ‘ম্যানেজ’ করতে জানেন বলেই তিনি এতদিন প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছেন।

এত অভিযোগ, বিতর্ক ও মামলার পরও তার পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন নিয়ে সচেতন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করছে। তাদের মতে, এটি শুধু একজন কর্মকর্তার বিষয় নয়; বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জবাবদিহির অভাবের প্রতিফলন। এই ধারা চলতে থাকলে গণপূর্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও কার্যক্রম আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডক্টর আশরাফুল ইসলামের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

  • Related Posts

    গভীর রাতে গুলশানের দুই ক্লাবে মাদকবিরোধী অভিযান

    রাজধানীর গুলশানে দুটি অভিজাত ক্লাবে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে গুলশানের মিডিয়া ক্লাব ও জার্মান ক্লাবে এ অভিযান শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,…

    গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীদের পদায়নে ‘লটারি প্রহসনের’ অভিযোগ: আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ, ১২০ কোটি টাকা অবৈধ আয়ের দাবি ঘিরে তোলপাড়

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের সাম্প্রতিক বদলি ও পদায়ন ঘিরে গুরুতর অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব, সরকারি চাকরির বিধিবিধানের অবমূল্যায়ন এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, লটারির মাধ্যমে পদায়নের…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    সৌদির আকাশসীমা ও বিমানবন্দরগুলো সম্পূর্ণ অনিরাপদ, হুতির হুঁশিয়ারি

    সৌদির আকাশসীমা ও বিমানবন্দরগুলো সম্পূর্ণ অনিরাপদ, হুতির হুঁশিয়ারি

    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ১০ দিনের ছুটি শুরু

    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ১০ দিনের ছুটি শুরু

    শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু আজ

    শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু আজ

    গভীর রাতে গুলশানের দুই ক্লাবে মাদকবিরোধী অভিযান

    গভীর রাতে গুলশানের দুই ক্লাবে মাদকবিরোধী অভিযান

    ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত দাম্মাম-রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত

    • By Sara
    • অক্টোবর ১৫, ২০২৬
    • 16 views
    ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত দাম্মাম-রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত

    বাংলাদেশের নদীপথে ভারতের নতুন বাণিজ্যযাত্রা

    • By Sara
    • অক্টোবর ১৫, ২০২৬
    • 12 views
    বাংলাদেশের নদীপথে ভারতের নতুন বাণিজ্যযাত্রা