প্রায় ৫ কোটি টাকার সাউন্ড সিস্টেম বিকল, সংসদে হেডফোন কেলেঙ্কারি—গণপূর্তের পাঁচ প্রকৌশলীর গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন
বিশেষ প্রতিবেদকঃ বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই দেখা দিয়েছে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিপর্যয়। প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপিত নতুন সাউন্ড সিস্টেম হঠাৎ করেই অচল হয়ে পড়ায় সাময়িকভাবে থমকে যায় সংসদের কার্যক্রম। একই সময়ে সংসদ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হেডফোনের নিম্নমান নিয়েও শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এই ব্যর্থতার দায় কার।
ঘটনার শুরু অধিবেশন চলাকালেই। নতুন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বক্তব্য দিতে শুরু করলে হঠাৎ করেই সংসদের মূল সাউন্ড সিস্টেমে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। মাইকে কথা বললেও তা পরিষ্কারভাবে শোনা যাচ্ছিল না। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত তাকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে বক্তব্য চালিয়ে যেতে হয়। এ সময় স্পিকার অধিবেশন ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি ঘোষণা করেন। বিরতির পর অধিবেশন আবার শুরু হলেও কিছু সময় পর্যন্ত শব্দ বিভ্রাট অব্যাহত ছিল। সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন প্রযুক্তিগত সমস্যাকে অনেকেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।
এদিকে এই ঘটনার আগেই সংসদে সরবরাহ করা হেডফোনের মান নিয়ে সরব হন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মির আহমেদ বিন কাশেম, যিনি ব্যারিস্টার আরমান নামেও পরিচিত। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে একটি কালো রঙের হেডফোনের ছবি পোস্ট করে তিনি অভিযোগ করেন, সংসদে দেওয়া হেডফোনের মান এতটাই নিম্নমানের যে ব্যবহার করতে গিয়ে কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা অনুভূত হয়েছে এবং শব্দের মানও অত্যন্ত খারাপ। তার এই মন্তব্য দ্রুতই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন এই সাউন্ড সিস্টেম কেনার জন্য প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সাধারণত সংসদের মতো উচ্চ নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে নতুন কোনো প্রযুক্তি চালুর আগে ১০ থেকে ১২ দিন পর্যন্ত নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। কিন্তু এই সিস্টেমের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, সাউন্ড সিস্টেমটি সরবরাহ করেছে আমানত এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যার মালিক দুলাল। ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা নিয়েও অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
সংসদ ভবনের বৈদ্যুতিক ও প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন প্রকৌশলী। তাদের মধ্যে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফুর রহমান এবং উপসহকারী প্রকৌশলী সামসুল ইসলাম রয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, তদারকির ঘাটতি, অযোগ্যতা ও অবহেলার কারণেই নতুন সাউন্ড সিস্টেম প্রথম দিনেই কার্যত ভেঙে পড়েছে।
এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আরও একটি পুরোনো বিতর্কও সামনে এসেছে। জানা গেছে, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক ২০১৮ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে সংসদ ভবনের দায়িত্বে থাকাকালেও অধিবেশন চলাকালে প্রায় ৪৫ মিনিট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার ঘটনা ঘটেছিল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলেও কেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এর মধ্যেই নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে বিদেশ সফরকে ঘিরে। সংসদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক অবসরের মাত্র কয়েক মাস আগে কারিগরি প্রশিক্ষণের নামে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সফরে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নাজমুল আলমসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার। এই প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু হচ্ছে HVAC সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ, যা সাধারণত মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিরাও এই সফরের তালিকায় রয়েছেন। ফলে অনেকেই এটিকে প্রশিক্ষণের আড়ালে আমলাতান্ত্রিক প্রমোদ ভ্রমণ বলে মন্তব্য করছেন।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এই সফরের ব্যয় বহন করবে ডানহাম–বুশ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, যারা HVAC রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নাজমুল আলম বলেছেন, এই সফরের খরচ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানই বহন করবে এবং এতে সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন দুর্নীতি বিরোধী বিশ্লেষকরা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোম্পানির টাকায় বিদেশ সফরের সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক সমস্যার অংশ, যা স্পষ্ট স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করে এবং সরকারি ক্রয়নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। তার মতে, অনলাইন যুগে প্রযুক্তিগত তথ্য জানার জন্য বিদেশ সফর অপরিহার্য নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এসব সফর ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করে।
এদিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই যখন প্রায় পাঁচ কোটি টাকার সাউন্ড সিস্টেম কার্যত অচল হয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই ক্রয় প্রক্রিয়া তদারকি করেছেন কারা এবং কেন যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই এটি চালু করা হলো। এখন দেখার বিষয়, দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, নাকি আগের মতোই সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যাবে।