কোটি টাকার সাউন্ড সিস্টেমেও সংসদে শব্দ সংকট, হেডফোনে অসুস্থতা—প্রকৌশলীদের গাফিলতির অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনসভা জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরুর দিনেই বড় ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা নতুন সাউন্ড সিস্টেম এবং হেডফোন ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ায় অধিবেশন চলাকালে একাধিকবার মাইক কাজ করেনি। এমনকি স্পিকারকে নিজের বক্তব্য দিতে গিয়ে বাধ্য হয়ে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে হয়েছে। নতুন হেডফোন ব্যবহারের পর কয়েকজন সংসদ সদস্যও শারীরিক অসুবিধার অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, হেডফোন ব্যবহার করার কিছু সময়ের মধ্যেই কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা শুরু হয়েছে এবং শব্দের মানও খুবই খারাপ।
ঢাকা–১৪ আসনের সংসদ সদস্য মির আহমেদ বিন কাশেম (ব্যারিস্টার আরমান) হেডফোনের মান নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সংসদে দেওয়া হেডফোন এতটাই নিম্নমানের যে কিছুক্ষণ ব্যবহার করতেই কান ও মাথায় ব্যথা শুরু হয়। তার মতে, সংসদের আগের পুরোনো অডিও ডিভাইসগুলোও সম্ভবত এর চেয়ে ভালো শব্দ দিত। তার এই মন্তব্যের পর আরও কয়েকজন সংসদ সদস্য জানান যে তাদের হেডফোন ঠিকমতো কাজ করেনি এবং অডিও পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সময় নতুন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বক্তব্য শুরু করতে গিয়ে দেখেন মাইক থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। কয়েকবার চেষ্টা করেও কাজ না করায় তাকে শেষ পর্যন্ত হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে তিনি সংসদ সদস্যদের ধৈর্য ধরার অনুরোধ করেন এবং জানান যে যান্ত্রিক সমস্যার কারণে শব্দ সঠিকভাবে শোনা যাচ্ছে না। পরে প্রায় ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন স্থগিত রাখতে বাধ্য হন তিনি। বিরতির পর আবার অধিবেশন শুরু হয়।
এই ঘটনার পর সংসদের অডিও সিস্টেম স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা হলেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) মো. আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফুর রহমান এবং উপসহকারী প্রকৌশলী সামসুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কোনো নতুন প্রযুক্তি চালুর আগে অন্তত ১০ থেকে ১২ দিন ধরে পরীক্ষামূলকভাবে চালিয়ে দেখার নিয়ম থাকলেও এবার সেই নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ফলে উদ্বোধনী অধিবেশনেই পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে চলে আসে।
এ ঘটনায় পুরোনো একটি ঘটনাও আবার আলোচনায় এসেছে। জানা যায়, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আশ্রাফুল হক আগে ২০১৮ সালেও সংসদ ভবনের দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময় অধিবেশন চলাকালে প্রায় ৪৫ মিনিট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার মতো ঘটনাও ঘটেছিল। ফলে তার দায়িত্ব পালন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সংসদের হেডফোন এবং গুজনেক মাইক্রোফোন বসানোর কাজ দেওয়া হয় আমানত এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানের আগে সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সংসদের অডিও সিস্টেমের কাজ করা প্রতিষ্ঠান **কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড**কে বাদ দিয়ে নতুন এই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুর রহমান জোয়ারদার দাবি করেন, তারা বিদেশি বিশেষজ্ঞ দিয়ে সিস্টেম পরীক্ষা করিয়ে একটি প্রতিবেদনও দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে নানা কৌশলে তাদের বাদ দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, সংসদ ভবনে এসি, আলো, অডিও সিস্টেম ও মাইক্রোফোনসহ মোট প্রায় ১২ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন স্থাপনেই প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। একটি গুজনেক মাইক্রোফোনের দাম প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা এবং প্রতিটি হেডফোনের দাম প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বলে জানা গেছে। কিন্তু এত টাকা খরচের পরও কেন এই ধরনের ত্রুটি দেখা দিল—তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কেউ স্পষ্টভাবে দায় স্বীকার করতে চাননি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, তিনি শুনেছেন যে হেডফোন ও মাইক্রোফোনে সমস্যা হয়েছে, তবে বিস্তারিত বিষয়টি তিনি জানেন না। অন্যদিকে সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা জানান, এই ঘটনার দায় তার নয়, তাই তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না।
এদিকে প্রযুক্তিগত ত্রুটি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই আরেকটি বিষয় নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। জানা গেছে, সংসদের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (HVAC) রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণের জন্য কয়েকজন কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. আশ্রাফুল হক, মো. নাজমুল আলম, কাজী মো. ফিরোজ হাসান, ডা. মো. তৌফিক হাসান ফিরোজ, মো. আশরাফুল ইসলাম, মো. রাজু আহমেদ, সিদ্দিকা নাসরিন সুলতানা এবং রিসালত বারী। এই সফরের সমস্ত খরচ বহন করবে ডানহাম–বুশ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। উপসচিব মো. নাজমুল আলম বলেন, এই সফরের ব্যয় সরকার দিচ্ছে না, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই সব খরচ বহন করবে।
তবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন Transparency International Bangladesh–এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তার মতে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থে বিদেশ সফরে যাওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে আমলাতন্ত্রের একটি সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে এবং সরকারি ক্রয়নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে অনেক প্রযুক্তিগত জ্ঞান অনলাইনের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রশিক্ষণ আসলে বিদেশ সফরের সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।
সব মিলিয়ে জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কোটি টাকার আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম বসানোর পরও উদ্বোধনী অধিবেশনেই মাইক বিকল হয়ে যাওয়া, হেডফোন নিয়ে অভিযোগ এবং অধিবেশন স্থগিত হওয়ার ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়; বরং ঠিকাদারি নির্বাচন, তদারকির অভাব এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার ফলও হতে পারে। এখন সবার প্রশ্ন—এত বড় প্রকল্পের পরও কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো এবং এর দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে।