ফায়ার সার্ভিসে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অস্থিরতা, জননিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

 

বিশেষ প্রতিবেদকঃ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সেবা সংস্থা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগ উঠছে। সংস্থাটির বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) এবং তার ঘনিষ্ঠ কিছু কর্মকর্তাকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে বলে অভ্যন্তরীণভাবে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে সংস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং জরুরি সেবার মানও কমে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে জনবল সংকট। প্রায় ৫০০ স্টেশন অফিসারের প্রয়োজন থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে ৩৫০টির মতো পদ খালি পড়ে আছে। ফলে আগুন বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর সাড়া দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এই অবস্থার মধ্যেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, আগেই তালিকা ঠিক করে রাখা, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচনের মতো গুরুতর অভিযোগ করেছেন অনেক কর্মকর্তা। এমনকি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কিছু ব্যক্তিকে চাকরিতে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

শুধু নিয়োগই নয়, ফায়ার সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ—ফায়ার সেফটি রিপোর্ট তৈরিতেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন ভবন বা স্থাপনার নিরাপত্তা রিপোর্ট দেওয়ার সময় ঘুষ নিয়ে অনুকূল প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে, যা সরাসরি মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বদলি বা ট্রান্সফারের ক্ষেত্রেও একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক কর্মকর্তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ইচ্ছেমতো বদলি করা হচ্ছে। চেইন অব কমান্ড ভেঙে জুনিয়র কর্মকর্তাদের দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে, যা পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

অন্যদিকে বাজেট ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের অসংগতি দেখা গেছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জ্বালানির জন্য অর্থের সংকট থাকলেও বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। এমনকি গত অর্থবছরে কিছু অর্থ খরচ না করে ফেরত দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যা নিয়ে ভেতরে ক্ষোভ রয়েছে।

মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য সদর দপ্তর স্থানান্তরের অভিযোগও উঠেছে। দীর্ঘদিনের সদর দপ্তর সিদ্দিক বাজার থেকে মিরপুরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে ট্রেনিং কমপ্লেক্স নারায়ণগঞ্জে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অর্থ ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের গরমিলের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন কোর্স থেকে প্রায় ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা আয় হলেও ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে মাত্র ৫৭ লাখ টাকা। বাকি বিপুল অর্থের কোনো স্পষ্ট হিসাব নেই এবং এখন পর্যন্ত কোনো অডিটও হয়নি। প্যাকেজ সেলের আয় নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যেখানে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা আয় হলেও তা নিয়ম মেনে খরচ করা হচ্ছে না।

এর আগে এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের ঘটনাও সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিক সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে এসব গাড়ি, ড্রাইভার ও অন্যান্য কর্মচারী ব্যবহার করছেন, যা নিয়মবহির্ভূত।

এছাড়া ট্রেনিং কমপ্লেক্সের কর্মকর্তাদের জোর করে নারায়ণগঞ্জে বদলি করা হলেও তারা এখনও সিটি অ্যালাউন্স নিচ্ছেন, যা সরকারি বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বিষয়ে অডিট আপত্তিও উঠেছে।

ফায়ার সার্ভিসের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স বিভাগের পরিচালকের বিরুদ্ধেও অদক্ষতার অভিযোগ রয়েছে। তার দায়িত্ব পালনের পর মাঠপর্যায়ে তদারকি কমে গেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তিনি অনুপস্থিত থাকেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে পুরো কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে।

সব মিলিয়ে, ফায়ার সার্ভিসের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ভেতরে-বাইরে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, নইলে এই গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।