নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে ৫০০ শয্যা হাসপাতাল নির্মাণে টেন্ডার কারসাজির অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ভবন নির্মাণকাজ ঘিরে গুরুতর টেন্ডার কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দরপত্র প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে অসঙ্গতি, গাণিতিক বিভ্রান্তি এবং উদ্দেশ্যমূলক সংশোধনের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।

জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই এই প্রকল্পের তৃতীয় দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়, যার টেন্ডার আইডি ছিল 1130979। প্রকল্পটির প্রাথমিক দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২৫৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা। তবে দরপত্র আহ্বানের এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম সংশোধনী প্রকাশ করা হয়, যেখানে TDS ও PCC-এর অসঙ্গতি দূর করার কথা বলা হলেও একইসঙ্গে BOQ-তে নতুন করে ৬০ টন রড (Reinforcement Steel) যোগ করা হয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের চলতি দর অনুযায়ী এই রডের মূল্য প্রায় ৭২ লাখ টাকা হওয়ায় প্রাক্কলিত মূল্য বাড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা কমিয়ে ২৫৪ কোটি ১২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা স্পষ্ট গাণিতিক অসঙ্গতির ইঙ্গিত দেয়।

এরপর আরও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে দরপত্র দাখিলের শেষ সময়ের মাত্র তিন দিন আগে। নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান তার ই-জিপি আইডি হ্যাক হওয়ার অজুহাতে দ্বিতীয় সংশোধনী প্রকাশ করেন। যদিও এই সংশোধনীতে BOQ-এর কোনো আইটেমের পরিমাণ পরিবর্তন করা হয়নি, তবুও সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করছে—এ সময় গোপনে দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা কমিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণ নিয়মে এই ধরনের তথ্য শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আইডি থেকেই দেখা সম্ভব, ফলে পুরো বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রাক্কলিত মূল্য কৌশলে কমিয়ে এনে নির্দিষ্ট একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—নুরানী-জামাল জেভি—কে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রাক্কলিত মূল্যের ১০ শতাংশ নিচের দরকে অস্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই প্রকল্পে গ্রহণযোগ্য সীমা প্রায় ২২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি দর দেয় ২২৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা নিয়ম অনুযায়ী অগ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সেই দরকেই Responsive হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, যা পুরো মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দরপত্র চলমান অবস্থায় এ ধরনের মৌলিক পরিবর্তন এবং প্রাক্কলিত মূল্য হেরফের সরাসরি সরকারি ক্রয় আইন (PPA-2006) ও বিধিমালা (PPR-2008) লঙ্ঘনের শামিল। আইনের Section-9 অনুযায়ী স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগততা এবং সমান প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও এই ঘটনায় তা স্পষ্টভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। একইসঙ্গে Rule-16 অনুযায়ী বাস্তবসম্মত প্রাক্কলন প্রস্তুত করার বিধান, Rule-31 অনুযায়ী দরপত্রের মৌলিক শর্ত অপরিবর্তিত রাখার নির্দেশনা এবং Rule-33 ও Rule-100 অনুযায়ী দর মূল্যায়নের নীতিমালা লঙ্ঘিত হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া, Rule-98 অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্রে কোনো ধরনের দরকষাকষি নিষিদ্ধ থাকলেও প্রাক্কলিত মূল্য কৌশলে পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে ‘Lowest Responsive’ বানানোর চেষ্টা পরোক্ষ দরকষাকষি ও যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে প্রতিযোগী দরদাতা, যেমন ‘হুদা কন্সট্রাকশন’-কে অযোগ্য করার অপচেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছে, এই ঘটনায় পরিকল্পিতভাবে প্রাক্কলিত মূল্য কমানো, আইটেম যোগ করেও ব্যয় হ্রাস দেখানো এবং অযোগ্য দরকে গ্রহণযোগ্য ঘোষণা করার মতো একাধিক অনিয়মের সমন্বয় ঘটেছে। যা কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং সংঘবদ্ধ দুর্নীতির লক্ষণ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে, এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।