ঢাকায় গণপূর্তে গোপন প্রভাববলয়: সমীরণ মিস্ত্রীকে ঘিরে বদলি ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকার গণপূর্ত অধিদপ্তরকে ঘিরে আবারও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। ভেতরের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, পুরো বিভাগজুড়ে এক ধরনের অদৃশ্য প্রভাববলয় কাজ করছে। এই বলয়ের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হিসেবে বারবার উঠে আসছে সমীরণ মিস্ত্রীর নাম। অফিসের ভেতরে-বাইরে তার প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। অনেকে মনে করেছিলেন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলাবে, কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রভাবশালী কিছু প্রকৌশলী এখনও রাজধানীতেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করে রেখেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারর ঘনিষ্ঠ একটি গোষ্ঠী এখনও সক্রিয় রয়েছে এবং সেই গোষ্ঠীর অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে সমীরণ মিস্ত্রীর নাম সামনে আসছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, প্রকল্প বণ্টন, এমনকি কর্মকর্তাদের কোথায় পোস্টিং হবে—এসব ক্ষেত্রেও তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, অনেক সিদ্ধান্তই নাকি আনুষ্ঠানিকভাবে নয়, বরং অঘোষিতভাবে এই প্রভাববলয়ের মাধ্যমে ঠিক করা হয়।

শেরেবাংলা নগর এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে মেরামতের নামে প্রায় ৮০ কোটি টাকার কাজ দেখানো হলেও বাস্তবে তার উল্লেখযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, এসব প্রকল্পের বিল-ভাউচারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং সেই টাকা কিছু ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে সংসদ সচিবালয়ের কাজ নিয়েও, যেখানে প্রকল্পের প্রকৃত কাজের তুলনায় খরচ অনেক বেশি দেখানো হয়েছে।

এছাড়া বদলি বাণিজ্য নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভেতরের তথ্য অনুযায়ী, পছন্দের জায়গায় পোস্টিং পেতে কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের টাকা দিতে হচ্ছে। এই তথাকথিত ‘পেইড পোস্টিং’ সিন্ডিকেটের সঙ্গে সমীরণ মিস্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে আলোচনা চলছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, ভালো পদে যেতে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হচ্ছে।

সমীরণ মিস্ত্রী দীর্ঘ সময় ধরে গণপূর্তের গুরুত্বপূর্ণ ইএম বিভাগ-৭ এ দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম, পরে গণপূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার এবং প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফ আহমেদর প্রভাব ব্যবহার করে তিনি নিয়ম বহির্ভূতভাবে একই বিভাগে বছরের পর বছর অবস্থান ধরে রাখেন। এমনকি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের—যেমন শেখ হেলালশেখ জুয়েল—সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর তাকে ইএম বিভাগ-৭ থেকে পিএন্ডডি বিভাগ-১ এ বদলি করা হয় এবং তার জায়গায় দায়িত্ব পান আনোয়ার হোসেন। কিন্তু বদলির পরও তার প্রভাব পুরোপুরি কমেনি বলে অভিযোগ। বিশেষ করে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসীকে নিয়েও ব্যাপক আলোচনা চলছে। বলা হচ্ছে, সমীরণ মিস্ত্রীর অনুরোধেই পরবর্তীতে সিফাত ওয়াসীকেও তার নতুন কর্মস্থলে বদলি করা হয়, যা ঘটেছে সরকারি ছুটির দিনেই—যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সিফাত ওয়াসীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি নিজ আওতাধীন এলাকায় দায়িত্ব পালনে চরম অদক্ষতা ও দুর্নীতির পরিচয় দেন। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বারবার আড়াল করা হয়েছে সমীরণ মিস্ত্রীর প্রভাবের কারণে। দায়িত্ব পালনের পুরো সময়টিতেই তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রীর সঙ্গে লেপ্টে ছিলেন।

এ নিয়ে সে সময়ে নানা কথাবার্তা উঠলেও সমীরণ তার ক্ষমতাবলে আগলে রেখেছিলেন সিফাত ওয়াসীকে। সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের স্ত্রী সিফাত ওয়াসীকে বদলি করার জন্য প্রধান প্রকৌশলীকে অনুরোধ জানালেও সমীরণ নিজ ক্ষমতাবলে তা আটকে দিয়েছিলেন। সে সময়ে গুঞ্জন উঠেছিল তারা বিয়ে করেছেন।

ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও এই দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে, যা অফিসের পরিবেশেও প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন অনেকে। যদিও এসব বিষয়ে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তাদের নীরবতা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে।

বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছুটা পরিবর্তনের আশা তৈরি হলেও এখনো পর্যন্ত মূল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, এই প্রভাবশালী চক্র এখনো আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে—গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও অনিয়মের অবসান আদৌ হবে কি না, নাকি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে সবকিছু আগের মতোই চলতে থাকবে। এখন সবার নজর নতুন নেতৃত্বের দিকে, তারা কতটা কার্যকরভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়।