এসএম বদরুল আলমঃ দেশজুড়ে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির প্রায় ৫৫টি ডিপো রয়েছে, আর এই ডিপোগুলোকে ঘিরেই দীর্ঘদিন ধরে তেল চুরির অভিযোগ ঘুরে ফিরে আসছে। বিভিন্ন কৌশলে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার তেল গায়েব হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চুরির সঙ্গে শুধু সাধারণ কর্মচারী নয়, বরং সিবিএ নেতা থেকে শুরু করে প্রভাবশালী কর্মকর্তা পর্যন্ত অনেকেই জড়িত বলে জানা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির পর দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ চোরাই তেল উদ্ধার হওয়ায় এই সিন্ডিকেট আবার আলোচনায় এসেছে।
সম্প্রতি পদ্মা অয়েলের গোদনাইল ডিপো থেকে কুর্মিটোলার পথে প্রায় ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল চুরির ঘটনা সামনে আসে। চারটি ট্যাংকার কাগজে-কলমে গন্তব্যে পৌঁছালেও বাস্তবে সেগুলো পৌঁছায়নি। এই জেট ফুয়েল মূলত বিমানের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে কম দামের কারণে এটি অকটেনের সঙ্গে মিশিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহা. মফিজুর রহমান বিষয়টি স্বীকার করে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন।
এর আগেও বড় ধরনের চুরির ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের জুনে যমুনা অয়েলের দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপো থেকে প্রায় ৬ লাখ লিটার তেল উধাও হয়ে যায়। তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং দেড় বছর পর কয়েকজন কর্মচারীকে মৌখিকভাবে বদলির সুপারিশ করা হয়। আশ্চর্যের বিষয়, এরপরও একই ডিপো থেকে আবার ৪৫ হাজার লিটার তেল গায়েব হয়ে যায়। অভিযোগ আছে, অডিট করতে গেলেও কৌশলে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। কিছু ডিলারের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে কাগজে-কলমে হিসাব মিলিয়ে দেওয়া হয়।
এই ডিপোতে দায়িত্বে থাকা সুপারভাইজার সমির পালের বিরুদ্ধেও পুরনো অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালে পতেঙ্গার গুপ্তখাল ডিপো থেকে তেল পাচারের ঘটনায় তিনি বরখাস্ত হয়েছিলেন। পরে কিছু টাকা আদায় করে তাকে আবার চাকরিতে ফিরিয়ে আনা হয় এবং বিভিন্ন ডিপো ঘুরে আবার একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরেক আলোচিত নাম হেলাল উদ্দিন, যিনি যমুনা অয়েলের সাবেক ইনচার্জ থেকে পরে ডিজিএম (অপারেশন) পদে উন্নীত হন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তেল চুরির টাকায় তিনি শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। চট্টগ্রামে একাধিক বাড়ি, বিদেশে ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি—সবই তার সম্পদের অংশ। এমনকি তার বাসা থেকেই এক সময় ২৫ লাখ টাকা চুরি হলেও তিনি কোনো আইনি পদক্ষেপ নেননি, কারণ এতে নিজেই বিপদে পড়তে পারেন বলে ধারণা করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত শুরু করলেও তা শেষ পর্যন্ত থেমে যায়।
তেল চুরির এই সিন্ডিকেটে সিবিএ নেতারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যমুনা অয়েল লেবার ইউনিয়নের সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ এয়াকুব দীর্ঘদিন ধরে এই চক্র নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তারা সাময়িক বরখাস্ত হলেও তাদের অনুসারী নাসির উদ্দিন বর্তমানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তিনি শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিল থেকে জোরপূর্বক অর্থ কেটে নেওয়ার জন্য চিঠিও দিয়েছেন, যা সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
অন্যদিকে মোংলা ডিপোতে অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৬১৩ লিটার তেল পাওয়া গেছে, যার কোনো হিসাব দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় ডিপোর ম্যানেজার আল আমিনকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ এলাকায়ও প্রকাশ্যে চোরাই তেল বিক্রির চিত্র দেখা যাচ্ছে। ফতুল্লা ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন ব্যক্তি যেমন স্বপন, কালাম, হৃদয়, রনি, পাগলা রাজু, ফয়সাল, কাইল্লা সোহেল, নাসির উদ্দিন, জালাল মিয়া, মাসুদ ও ইকবাল চৌধুরীর নেতৃত্বে আলাদা আলাদা চক্র সক্রিয় রয়েছে। তারা ট্যাংকার থেকে অতিরিক্ত তেল সরিয়ে বিক্রি করে দেয়। এছাড়া নদীপথে জাহাজ থেকে তেল নামানোর সময়ও চুরি হয়।
অনেক ক্ষেত্রে ট্যাংকারে ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতা থাকলেও কাগজে ৯ হাজার লিটার দেখানো হয়, আর বাড়তি তেল মাঝপথেই বিক্রি হয়ে যায়। বিভিন্ন জায়গায় খোলা বাজারে অবৈধভাবে ডিজেল ও অকটেন বিক্রি হচ্ছে, যার সঙ্গে ডিপোর কিছু কর্মচারীর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, তেল চুরি এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, আর জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।











