এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকা ওয়াসার ২ নম্বর জোনের রাজস্ব কর্মকর্তা এএমএম ইকরামকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। জালিয়াতি, মিথ্যাচার, দলীয় প্রভাব খাটানো, ঘুষ বাণিজ্য এমনকি একই সঙ্গে দুটি সরকারি চাকরি করার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট মহলে এসব কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি ‘ঢাকা ওয়াসার ইবলিশ’ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, তথ্য গোপন করে একদিকে ঢাকা ওয়াসায় চাকরি চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তিনি নোয়াখালী পৌরসভার সচিব হিসেবেও দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৯ বছর ধরে তিনি দুই প্রতিষ্ঠান থেকেই নিয়মিত বেতন তুলেছেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তিনি নোয়াখালী পৌরসভার চাকরি ছেড়ে দেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী চাকরিচ্যুত হওয়ার কথা থাকলেও ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ তাকে কেবল নিম্নতর বেতন স্কেলে নামিয়ে শাস্তি দিয়ে দায়িত্বে বহাল রাখে।
জানা যায়, ২০০১ সালের ৯ অক্টোবর উচ্চমান সহকারী (ইউডিএ) পদে ঢাকা ওয়াসায় যোগ দেন ইকরাম। চাকরির শুরুর দিকে তাকে বোতলজাত পানি উৎপাদন প্ল্যান্টে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে তার বিরুদ্ধে প্রথম আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়ে, যেখানে উল্লেখ করা হয় তিনি একই সময়ে নোয়াখালী পৌরসভায় সচিব হিসেবে কর্মরত থেকে বেতন নিচ্ছেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে তার দ্বৈত চাকরির বিষয়টি সত্য বলে প্রমাণিত হয়।
সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা বিধিমালা-১৯৭৯ অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারীর একাধিক চাকরি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলেও ইকরামের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তার বেতন স্কেল সামান্য কমিয়ে দেওয়া হয় এবং বরখাস্তকালীন সময়কে ‘অসাধারণ ছুটি’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
তথ্য অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ওয়াসায় কর্মরত থাকা অবস্থায়ই তিনি নোয়াখালী পৌরসভায় সচিব পদে আবেদন করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ২০০৫ সালের ৭ জুন সেখানে যোগ দেন। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি দুই জায়গায় সমান্তরালভাবে দায়িত্ব পালন করেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজে উপস্থিত না থেকে অন্য কাউকে দিয়ে দায়িত্ব পালন করাতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পদোন্নতি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তাকে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা ২০১৩ সাল থেকে কার্যকর দেখানো হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি তাকে রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। অথচ তার আগের জ্যেষ্ঠ ২৫ জন কর্মকর্তা এখনো একই পদে রয়ে গেছেন, যা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে তিনি উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (ডিসিআরও) পদে পদোন্নতির জন্যও তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন, যদিও সংশ্লিষ্টদের মতে এই পদে উন্নীত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা তার নেই। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়াও, প্রেষণ ছাড়াই পিপিআই প্রকল্পে ফিল্ড সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং একই সময়ে একাধিক উৎস থেকে বেতন গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার স্ত্রী সালমা আক্তার মিনা ঢাকা ওয়াসার পিএন্ডডি সার্কেলে পিএ কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে মাস্টাররোলে কর্মরত আছেন। অভিযোগ আছে, আত্মীয়স্বজনদের আউটসোর্সিং ও মাস্টাররোলে নিয়োগ দিতেও তিনি প্রভাব খাটিয়েছেন।
এদিকে তার সহকর্মীদের পক্ষ থেকে একাধিক লিখিত অভিযোগ ওয়াসা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক নয়, ফৌজদারি অপরাধের মধ্যেও পড়ে। তাদের মতে, এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত এবং যারা তাকে লঘুদণ্ড দিয়েছেন তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য এএমএম ইকরামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।











