নৌ-প্রশিক্ষণ খাতে কোটি টাকার সিন্ডিকেটের অভিযোগ, কেন্দ্রবিন্দুতে প্রিন্সিপাল অফিসার সাব্বির মাহমুদ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ নৌ-প্রশিক্ষণ খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নতুন করে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের মূল নেতৃত্বে রয়েছেন নৌ বাণিজ্য দপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ, যিনি বিভিন্ন মহলে “সাব্বির মাদানি” নামেও পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি পদ-পদবি ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত একাধিক প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম, টেন্ডার কারসাজি এবং আর্থিক দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই চক্রের কারণে দেশের নৌ-প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেরিন একাডেমিতে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় থেকেই সাব্বির মাহমুদ আবাসন ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তবে ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসানের কারণে তিনি কয়েক কোটি টাকার দেনায় পড়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে নৌ বাণিজ্য দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়ার পরই তার আর্থিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। অভিযোগ উঠেছে, সিমুলেটর কেনাকাটা ও প্রশিক্ষণ প্রকল্প নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন।

সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় সরাসরি ব্যবসা পরিচালনায় আইনগত বাধা থাকায় তিনি নিজের শ্যালক কাজী হাবিবুল হোসেনকে সামনে এনে “ইরেকটর্স” নামের একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পেশায় আগে সাধারণ ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের কাজ করলেও হঠাৎ করেই কাজী হাবিব বড় ঠিকাদার ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির আড়ালের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ছিল সাব্বির মাহমুদের হাতেই। টেন্ডারের কাগজপত্র তৈরি, ব্যাংকিং কার্যক্রম দেখা এবং বিভিন্ন নথিতে “পরামর্শক” পরিচয়ে স্বাক্ষর করার কাজও তিনি নিজেই করতেন বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর।

সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জের ডিইপিটিসি (ডেক ইঞ্জিন পার্সোনেল ট্রেনিং সেন্টার) প্রকল্প নিয়ে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের বিআরডব্লিউটিপি-জি৩সি টেন্ডারে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সরকারি প্রকল্পের কারিগরি স্পেসিফিকেশন তৈরি করার দায়িত্ব সরকারি কর্তৃপক্ষের। কিন্তু এখানে টেন্ডারে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠান “এআরআই-ইরেকটর্স” নিজেরাই সেই স্পেসিফিকেশন তৈরি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে এমনভাবে শর্ত সাজানো হয়, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েও কার্যত বাদ পড়ে যায়।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আইয়ুব আলীর সহযোগিতায় সাব্বির মাহমুদ এবং তার ভারতীয় সহযোগী অমিত ভট্টাচার্য পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন। এমনকি নরওয়ের বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান “কনসবার্গ” টেন্ডার নিয়ে আপত্তি তুললেও তা গুরুত্ব পায়নি। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পাঠানো বিভিন্ন ই-মেইলের উত্তরও সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সাব্বির মাহমুদ নিজেই তৈরি করতেন, যা ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির আরও ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, শুরুতে কোনো সিল বা স্বাক্ষর ছাড়া দরপত্র জমা দেওয়া হলেও রহস্যজনকভাবে তা বাতিল করা হয়নি। পরে মূল্যায়নের আগ মুহূর্তে শতাধিক পৃষ্ঠায় গোপনে স্বাক্ষর সংযুক্ত করা হয়। কিছু নথিতে জাল স্বাক্ষর ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। একই প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করার বিষয়টিও সামনে এসেছে, যা পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, মেরিন একাডেমি ও এনএমআই-এর আরও কয়েকটি প্রকল্পেও একই ধরনের সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক নৌমন্ত্রী শাহজাহান খানের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেই দীর্ঘদিন এই চক্র নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। ফলে অনেক কর্মকর্তা অনিয়ম জানলেও প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস পাননি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত কোনো প্রকল্পে এমন অনিয়ম প্রমাণিত হলে পুরো প্রকল্প “মিস-প্রকিউরমেন্ট” হিসেবে ঘোষণা হতে পারে। এতে শুধু প্রকল্প বাতিল হওয়ার ঝুঁকিই নয়, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভবিষ্যতে বিদেশি সহায়তা, উন্নয়ন প্রকল্প এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি নিম্নমানের বা অনিয়মের মাধ্যমে কেনা সিমুলেটর ব্যবহারের কারণে দেশের নৌ-প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে সাব্বির মাহমুদ দাবি করেন, তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং এসব অভিযোগের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি “ইরেকটর্স” ও বিআইডব্লিউটিএ’র সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তবে পরবর্তীতে আর বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।