বিসিএস ছাড়াই ৬ষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগ: গণপূর্তে জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্বৈরাচারী আওয়ামী শাসনামলে সরকারি চাকরিতে দলীয়করণ, প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ এবং প্রশাসনে ক্ষমতার অপব্যবহারের বহু অভিযোগের মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি বহুল আলোচিত নিয়োগ প্রক্রিয়া আবারও নতুন করে সামনে এসেছে।

অভিযোগ উঠেছে, নিয়মিত বিসিএস পদ্ধতি অনুসরণ না করে বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে কয়েকজনকে সরাসরি ৬ষ্ঠ গ্রেডে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সেই বিতর্কিত নিয়োগপ্রাপ্তদের একজন মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রভাবশালী নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প ও টেন্ডার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রমতে, গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাধারণত বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে ৯ম গ্রেডে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগের বিধান থাকলেও বিশেষ একটি প্রভাবশালী মহল পিএসসির মাধ্যমে মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, সমীরণ মিস্ত্রী, জিয়াউর রহমান, মোঃ আবু তালেবসহ কয়েকজনকে সরাসরি ৬ষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগের ব্যবস্থা করে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূইয়া এবং সাবেক এমপি শেখ সেলিম ও শেখ হেলালের তদবিরে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। অভিযোগ আরও রয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাকি পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান এটিএম আহমেদুল হককে সরাসরি ফোন করে লিখিত কিংবা প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ছাড়াই নির্ধারিত তালিকার প্রার্থীদের শুধুমাত্র মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে নামমাত্র ভাইভা গ্রহণ করে ওই তালিকার ১১ জনকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। এই নিয়োগের বিরুদ্ধে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের একটি অংশ হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে আদালত ১৭টি পদ বিসিএস কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেন।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, আদালতের সেই আদেশ কার্যত উপেক্ষা করা হয়। শুধু তাই নয়, বিতর্কিতভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চাকরিতে বহাল রাখার পাশাপাশি সংরক্ষিত কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে সিনিয়রিটিও প্রদান করা হয়। সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি উঠেছে চাকরিতে যোগদান এবং বেতন উত্তোলন নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, আদালতের স্থগিতাদেশ চলাকালীন সময়ে প্রায় ১১ মাস ব্যাকডেট দেখিয়ে যোগদানপত্র তৈরি করা হয় এবং চাকরিতে উপস্থিত না থেকেও সরকারি কোষাগার থেকে বকেয়া বেতন উত্তোলন করা হয়। এ সময় মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বিআইডাব্লিউটিএতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং সেখান থেকে নিয়মিত সরকারি বেতন গ্রহণ করছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকেও তিনি বেতন উত্তোলন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ একই সময়ে দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন গ্রহণের মাধ্যমে সরকারি চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘন ও আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

শুধু জাহাঙ্গীর আলম নন, মোঃ আইয়ুব আলী মেরিন একাডেমিতে এবং মোঃ নাফিজ আহমেদ রাজশাহীতে সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া অন্য কয়েকজন বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও পরে ব্যাকডেট দেখিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগদানের সুবিধা নেন বলে দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব অনিয়মের পেছনে সাবেক সচিব শহীদ উল্লাহ খন্দকার, শেখ সেলিম, শেখ হেলাল এবং সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূইয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব কাজ করেছে।

এদিকে সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদপ্তরের “পি পি ডব্লিউ ডি উড ডিভিশন” ঘিরেও নতুন করে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। সূত্র দাবি করেছে, প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কাঠ ও ফার্নিচার সংক্রান্ত প্রকল্পকে কেন্দ্র করে নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বিশেষ একটি ইউনিটে পদায়নের জন্য এক প্রভাবশালী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দেন। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডিপিপির আওতাধীন প্রকল্পকে দুই ভাগে বিভক্ত করে কমিশন বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রধান প্রকৌশলীর সামনেই সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয় এবং প্রধান প্রকৌশলীর ভাই “মামুন”-এর নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। পুরো সিন্ডিকেট পরিচালনায় নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জাহাঙ্গীর আলম সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। সূত্র জানায়, হাতিল, পশ ফার্নিচার, রিগেল ফার্নিচার, আকতার ফার্নিচার ও ডট ফার্নিচারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন কাজ বণ্টনের অভিযোগও রয়েছে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে পৃথক তদন্ত চলমান থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি প্রায় দেড়শ কোটি টাকার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান বিপ্লব বলেন, “রিপোর্টটি আগেই দেওয়ার কথা ছিল। কেন দেওয়া হয়নি জানি না। তবে দ্রুত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য আবারও চিঠি দেওয়া হবে।” সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, রাজনৈতিক প্রভাব ও শক্তিশালী ছত্রছায়া ছাড়া একজন বিতর্কিত কর্মকর্তা কীভাবে বছরের পর বছর বড় বড় প্রকল্প ও টেন্ডার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন? নাকি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে এখনও সক্রিয় রয়েছে পুরোনো সেই প্রভাবশালী সিন্ডিকেট? এখন সংশ্লিষ্ট সবার নজর দুর্নীতি দমন কমিশন ও তদন্ত সংস্থাগুলোর দিকে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।