“সিনিয়র স্কেল ছাড়াই পদোন্নতির ছক” : গণপূর্তে সারোয়ার জাহান বিপ্লবের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ
এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরে আবারও সামনে এসেছে বহুল আলোচিত পদোন্নতি বাণিজ্য ও জ্যেষ্ঠতা কারসাজির ভয়ংকর চিত্র। এবার অভিযোগের তীর গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মোহাম্মদ সারোয়ার জাহান বিপ্লবের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ উঠেছে—সরকারি চাকরি বিধি, চলমান আদালতের মামলা, এমনকি মন্ত্রণালয়ের কাছে দাখিল করা আপত্তিকর তথ্যও গোপন করে অবৈধভাবে কিছু বিতর্কিত নির্বাহী প্রকৌশলীকে ৫ম গ্রেডের ঊর্ধ্বতন পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। এ নিয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, সচিবালয় এবং অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের ২৭, ২৮ ও ৩০তম ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন—“যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ কিছু কর্মকর্তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে উন্নীত করার জন্য কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে।”

মামলা চলমান, অথচ মতামতে ‘খারিজ’ দেখালেন বিপ্লব!
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-৭ এর স্মারক নং-২৫.০০.০০০০.০০০.১৩০.১৯.০০১৭.১৮(অংশ-১)-১১৫, তারিখ ১৫/০২/২০২৬ এর আলোকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের ই/এম অংশের জ্যেষ্ঠতা তালিকা ও পদোন্নতি সংক্রান্ত বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে ০৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখা-১ থেকে স্মারক নং-২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১২.১০৭.১৮-৩৫২ জারি করে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সারোয়ার জাহান বিপ্লব একটি মতামত পাঠান। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ১৭টি পদ সংরক্ষণ নিয়ে দায়ের হওয়া মামলা “মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট কর্তৃক খারিজ” হয়েছে এবং পুনরুজ্জীবনের আবেদনও ১৭/১২/২০২৪ তারিখে “খারিজ” হয়েছে।
কিন্তু বিসিএস কর্মকর্তারা সচিব বরাবর পাল্টা আবেদনে দাবি করেন—এ তথ্য সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মহামান্য আপিল বিভাগে Civil Petition No. 4340/2024 এখনও বিচারাধীন রয়েছে। এমনকি “Rejected for not press” অর্থ মামলা খারিজ নয়, বরং আবেদনকারী শুনানির সময় নতুন তথ্য সংযোজনের সুযোগ নিয়ে আবেদন প্রত্যাহার করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, চলমান মামলা সম্পর্কে মন্ত্রণালয়কে ভুল তথ্য দিয়ে পদোন্নতির পথ পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন বিপ্লব।
“সিনিয়র স্কেল ছাড়া পদোন্নতি নয়”—বিধি উপেক্ষার অভিযোগ : বিসিএস কর্মকর্তাদের আবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পদোন্নতির জন্য পরীক্ষা) বিধিমালা, ২০১৭ অনুযায়ী ৫ম গ্রেডের ঊর্ধ্বে পদোন্নতির ক্ষেত্রে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
কিন্তু অভিযোগ হলো—সরোয়ার জাহান বিপ্লব ইচ্ছাকৃতভাবে সেই বিধির ব্যাখ্যা বিকৃত করে মন্ত্রণালয়ে মতামত দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, সরাসরি ৬ষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগপ্রাপ্ত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রে এ বিধি প্রযোজ্য নয়। এ নিয়ে বিসিএস কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন—যদি পদোন্নতির ক্ষেত্রেও একই নিয়োগ বিধিমালা ব্যবহার করা হয়, তাহলে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষার বিধান কেন প্রযোজ্য হবে না? তাদের অভিযোগ, সাংবিধানিকভাবে “সমান সুযোগের নীতি” উপেক্ষা করে অবৈধ সুবিধাভোগীদের পদোন্নতি দিতে প্রশাসনিক কারসাজি করা হচ্ছে।
আদালতের স্থগিতাদেশ চলাকালীন নিয়োগ—গোপন রাখা হলো কেন ? বিসিএস কর্মকর্তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ চলাকালে জারি হওয়া নিয়োগ প্রজ্ঞাপনের বৈধতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। অথচ সারোয়ার জাহান বিপ্লবের পাঠানো মতামতে এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
তারা দাবি করেন, জ্যেষ্ঠতা তালিকায় ০৪/০৯/২০১২, ১৮/০৯/২০১২ এবং ১৯/০৯/২০১২ তারিখে যোগদানের তথ্য যুক্ত করা হলেও সেই নিয়োগের বৈধতা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন বিচারাধীন। এমনকি দায়িত্ব পালন না করেও বকেয়া বেতন উত্তোলনের অভিযোগের ব্যাখ্যাও মতামতে অনুপস্থিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নতুন চিঠি: আবারও ব্যাখ্যা চাওয়া :
বিতর্কিত মতামতের পর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ১০ মে ২০২৬ তারিখে স্মারক নং-২৫.০০.০০০০.০০০.১৩০.১৯.০০১৭.১৮(অংশ-১)-৩৮৯ জারি করে নতুন করে সুস্পষ্ট মতামত চায়। চিঠিতে বলা হয়, বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের ই/এম অংশের কর্মকর্তারা জ্যেষ্ঠতা তালিকার পক্ষে ও বিপক্ষে পৃথক আবেদন জমা দিয়েছেন। এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত ও স্পষ্ট মতামত দিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হলো। সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, “প্রথম মতামতে বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকায় মন্ত্রণালয় সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তাই পুনরায় ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।”
“জামানতের টাকা আত্মসাৎ” কাণ্ডেও অভিযুক্ত ছিলেন বিপ্লব : মোহাম্মদ সারোয়ার জাহান বিপ্লবের বিরুদ্ধে এর আগেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অধিশাখা-৫ এর অফিস আদেশ নং-২৫.০০.০০০০.০৩৭.০১৮.২৭.০০০৩.২৫-২৩৯, তারিখ ২৯ জুন ২০২৫ অনুযায়ী, গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে কর্মরত অবস্থায় কাশিমপুর কারাগার-২ প্রকল্পে HT Cable Fault Locator মেশিন সরবরাহের বিপরীতে ঠিকাদারের ১০ লাখ টাকার পে-অর্ডার অবৈধভাবে ক্যাশ করার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়। তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়।
তবে শেষ পর্যন্ত “চাকরি জীবনের প্রথম অপরাধ” বিবেচনায় তাকে সতর্ক করে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন উঠেছে—যে কর্মকর্তা নিজেই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন, তিনি কীভাবে আবারও বিতর্কিত পদোন্নতি প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন ?
“ঘুষের টাকায় পদোন্নতির ব্লু-প্রিন্ট” : গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পেতে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন চলছে। তাদের অভিযোগ, “যারা সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নন, তাদের পদোন্নতির পথ খুলে দিতে বিপ্লব সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন।” এক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যোগ্য কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে টাকার বিনিময়ে পদোন্নতির সংস্কৃতি চালু হয়েছে। প্রশাসনিক মতামত পর্যন্ত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।”
গণপূর্তের ভাবমূর্তি কোথায় যাচ্ছে ? দীর্ঘদিন ধরেই গণপূর্ত অধিদপ্তরকে ঘিরে টেন্ডার বাণিজ্য, পদোন্নতি সিন্ডিকেট, নিয়োগ কারসাজি এবং আদালতের আদেশ উপেক্ষার অভিযোগ রয়েছে। নতুন করে সারোয়ার জাহান বিপ্লবকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগ সেই সংকটকে আরও গভীর করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন দেখার বিষয়—গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কি আদালতে বিচারাধীন ও বিধিবহির্ভূত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়, নাকি পুরো প্রক্রিয়াটি পুনর্বিবেচনায় নেয়।