বিআইডব্লিউটিএর নৌ-সংরক্ষণ বিভাগে অনিয়মের অভিযোগ: টেন্ডার, কমিশন বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট নিয়ে প্রশ্ন
এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর নৌ-সংরক্ষণ বিভাগে বিভিন্ন প্রকল্প ও ক্রয় কার্যক্রমকে ঘিরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, কমিশন বাণিজ্য এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সক্রিয়তার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময় যেসব অভিযোগ সামনে এসেছিল, সেগুলোর যথাযথ নিষ্পত্তি না হওয়ায় একই ধরনের কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বয়া বাতি, বিকন বাতি, বাঁশের মার্কা, পল্টুন স্থাপন, প্রতিস্থাপন ও স্থানান্তরসহ বিভিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া উদ্ধারকারী নৌযানগুলোর কাগুজে মেরামত, জ্বালানি তেল ক্রয় এবং নৌযানের ট্রায়ালের নামে বিপুল পরিমাণ তেল অপচয় বা আত্মসাতের অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়ে আসছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, নৌসংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা মো. শাহাজল বদলি হলেও বিভাগের কার্যক্রমে অভিযোগের ধরণে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং পূর্ববর্তী সময়ে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
‘কমিশন ছাড়া কাজ পাওয়া কঠিন’ : বিভিন্ন ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, নৌ-সংরক্ষণ বিভাগের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে কাজ পেতে হলে কমিশন প্রদান কার্যত অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করেন, বর্তমান পরিচালক ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শাহজাহানের সময়েও ওই সিন্ডিকেটের প্রভাব বহাল রয়েছে এবং কমিশন ছাড়া কোনো কাজ অনুমোদন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ই-জিপি (e-GP), ওটিএম (OTM) এবং এলটিএম (LTM) পদ্ধতিতে বাস্তবায়িত বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় প্রকাশিত হয়নি।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ : সেবা গ্রহণকারী ও বিভাগ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, পরিচালক ক্যাপ্টেন শাহজাহান নাকি কমিশন ছাড়া কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করেন না। এমনকি তার নির্দেশনার বাইরে গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি বা প্রশাসনিকভাবে চাপে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। একাধিক সূত্রের দাবি, ভবনের ভেতরে তিনি একজন অত্যন্ত কৌশলী ও প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, সাবেক এক পরিচালকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এবং প্রতিদিন সন্ধ্যায় নিয়মিত সাক্ষাতের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এমনকি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো নথি বা প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের দাবি, সাবেক ও বর্তমান প্রশাসনের মধ্যে একই এলাকার হওয়ার কারণে একটি বিশেষ সমন্বয় বা প্রভাববলয় কাজ করছে, যার কারণে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
তথ্যপ্রাপ্তিতে বাধা ?
অভিযোগকারীরা আরও বলেন, পরিচালকের কার্যালয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশ এবং সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে বিভাগের অনেক অনিয়ম ও অভিযোগ জনসমক্ষে আসতে পারছে না বলে তাদের দাবি। এছাড়া পরিচালকের সম্পদ, আর্থিক লেনদেন এবং জীবনযাত্রার মান নিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, একটি স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালিত হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা বেরিয়ে আসতে পারে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কমিশন আদায়ের ক্ষেত্রে পরিচালকের একজন পিয়ন বা ঘনিষ্ঠ সহায়কের মাধ্যমে যোগাযোগ ও লেনদেন পরিচালিত হয়।
পরিচালকের বক্তব্য :
অভিযোগের বিষয়ে বর্তমান পরিচালক ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শাহজাহানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি যা করি, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত আছেন।” এর বাইরে তিনি আর কোনো বিস্তারিত মন্তব্য করেননি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি :
এদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, বিআইডব্লিউটিএর নৌ-সংরক্ষণ বিভাগের টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়ন, জ্বালানি ক্রয়, নৌযান পরিচালনা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনা করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পথও সুগম হবে বলে তারা মনে করেন।