অভিযোগ নাকি চরিত্রহননের কৌশল?’— আরিফ হাসনাতকে ঘিরে একতরফা প্রচারণা নিয়ে প্রশ্ন
বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) এ কে এম আরিফ উদ্দিন ওরফে আরিফ হাসনাতকে ঘিরে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত ধারাবাহিক প্রতিবেদনের নিরপেক্ষতা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, যাচাই-বাছাই ছাড়াই একতরফাভাবে একজন কর্মকর্তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মৌলিক শর্ত হচ্ছে তথ্যের বহুমাত্রিক যাচাই, নথিপত্র বিশ্লেষণ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য যথাযথভাবে তুলে ধরা। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে অভিযোগের ভাষাই যেন রায়ে পরিণত হয়েছে।
‘দুই হাজার কোটি টাকার লুট’— কোথায় সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদন ?
প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ ‘পানির দামে’ বিক্রির অভিযোগ আনা হলেও এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদন, আদালতের পর্যবেক্ষণ বা তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত রিপোর্ট উপস্থাপন করা হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে—দুদকের অনুসন্ধান চলমান থাকা অবস্থায় কীভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘লুটেরা’, ‘সিন্ডিকেট প্রধান’ বা ‘দুর্নীতির হোতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো।
অনুসন্ধান মানেই অপরাধ প্রমাণ নয় : দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান প্রক্রিয়া কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ করে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতেই অনুসন্ধান পরিচালিত হয়। অথচ কিছু প্রতিবেদনে অনুসন্ধানকে চূড়ান্ত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে মনে করছেন গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা।
ব্যক্তিগত জীবন টেনে আনার উদ্দেশ্য কী?
আরিফ হাসনাতকে ঘিরে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা কথিত ভিডিও সংক্রান্ত যেসব দাবি প্রচার করা হয়েছে, সেগুলোর সত্যতা কোথাও নিশ্চিত করা হয়নি। ভিডিওর উৎস, সময়, প্রেক্ষাপট কিংবা ফরেনসিক যাচাই ছাড়াই এসব তথ্য প্রকাশের প্রচেষ্টা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নৈতিক সাংবাদিকতার প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
সাংবাদিক মহলের একাংশের মতে, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনকে ব্যবহার করে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার অভিযোগ :
প্রতিবেদনগুলোতে বারবার অতীত রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে ধরা হলেও এ বিষয়ে কোনো প্রামাণ্য নথি বা আনুষ্ঠানিক তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে অনেকেই এটিকে প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
প্রশ্নের মুখে একতরফা সাংবাদিকতা : গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু তদন্তের আগেই তাকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই চরিত্রহননের দায়ও সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে।
এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত:
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, আরিফ হাসনাতকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো যেমন নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে, তেমনি অভিযোগভিত্তিক একতরফা প্রচারণার উৎস, উদ্দেশ্য ও পেছনের স্বার্থও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে যেকোনো অভিযোগের সত্যতা উদঘাটন যেমন জরুরি, তেমনি কোনো ব্যক্তিকে প্রমাণ ছাড়া ‘দুর্নীতির প্রতীক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রবণতাও গণমাধ্যম ও সমাজের জন্য উদ্বেগজনক।
অনুসন্ধানের চূড়ান্ত ফলাফল না আসা পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এটি কি সত্যিই একটি বৃহৎ দুর্নীতির কাহিনি, নাকি প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাতে গড়ে ওঠা একটি পরিকল্পিত চরিত্রহননের অভিযান ?