বিআইডব্লিউটিসিতে ক্ষমতার প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ, নজরে পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান

এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)-এর পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামানকে ঘিরে নানা অভিযোগের কারণে আবারও আলোচনায় এসেছে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা। তার বিরুদ্ধে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, টেন্ডার ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তার, জাহাজ মেরামতের কাজে স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধান শুরু করেছে এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথিপত্র সংগ্রহ করছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, বিআইডব্লিউটিসির গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে আশিকুজ্জামান প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেছেন। বিশেষ করে সংস্থার জমি, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রমে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, করপোরেশনের সম্পদ রক্ষার বদলে কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সুবিধা পেয়েছে। এ নিয়ে বিআইডব্লিউটিসির ভেতরেও একাধিকবার অসন্তোষ তৈরি হয়েছে এবং কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

তার চাকরিজীবনের পদোন্নতির বিষয় নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, এস এম আশিকুজ্জামান এজিএম ফিডার পদে নির্ধারিত সময় পূর্ণ করার আগেই ২০১৫ সালে ডিজিএম (সাময়িক) পদে দায়িত্ব পান। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত বিধিমালায় এমন পদোন্নতির সুযোগ ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পরে ডিজিএম পদে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই তিনি আরও উচ্চ পদে দায়িত্ব পান বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

২০১৮ সালে তিনি বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) পদে দায়িত্ব পাওয়ার পর তার প্রভাব আরও বেড়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, ওই সময় থেকে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং বিভিন্ন ক্রয়সংক্রান্ত কাজে একটি প্রভাবশালী মহল সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেই প্রক্রিয়ায় আশিকুজ্জামানের ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তের বিষয়।

তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম। অভিযোগ রয়েছে, বিআইডব্লিউটিসিতে প্রায় ৬০০ জন অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের সময় আর্থিক লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকজন প্রার্থী বয়স ও যোগ্যতার শর্ত পূরণ না করেও চাকরি পেয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাই করতে দুদক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, অনুমোদনপত্র, সভার সিদ্ধান্ত, নোটশিট এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকাসহ বিভিন্ন নথি সংগ্রহ করেছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া জাহাজ মেরামত ও সংস্কারকাজ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু মেরামত কাজে নিয়মিত দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের হাতিয়া থেকে ভাসানচর পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত এসটি জব্বার জাহাজ মেরামতের ক্ষেত্রে টেন্ডার ছাড়াই বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে আইভি রহমান নামের আরেকটি জাহাজের সংস্কারকাজ নিয়েও। অভিযোগকারীদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র না থাকায় সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে লুজ যাত্রী পারাপারের টিকিট ও ইজারা ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ করা হয়েছে, কম মূল্যে ইজারা দেওয়ার কারণে সরকার প্রত্যাশিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করছে দুদক।

এদিকে এমভি বঙ্গমাতা ও এমভি বঙ্গতরী নামের দুটি জাহাজ নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে।

দুদকের অনুসন্ধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আশিকুজ্জামান ও তার স্ত্রী ফারজানার সম্পদের তথ্য যাচাই। অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের নামে থাকা জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠান, ভূমি অফিস, রেজিস্ট্রি অফিস এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে এস এম আশিকুজ্জামান জানিয়েছেন, জাহাজ মেরামত, ক্রয় বা সংশ্লিষ্ট অনেক কাজ তার সরাসরি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তিনি বলেছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার দায়িত্ব দুদকের এবং তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত বিষয় সামনে আসবে।

সব মিলিয়ে এস এম আশিকুজ্জামানকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। নিয়োগ থেকে শুরু করে টেন্ডার, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক কার্যক্রম—বিভিন্ন বিষয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর উত্তর মিলবে তদন্ত শেষে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে, আর অভিযোগের সত্যতা না মিললে দীর্ঘদিনের বিতর্কেরও অবসান হবে।