ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পের ক্ষত কাটতে না কাটতেই শক্তিশালী পরাঘাত, রাস্তায় মানুষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের পাঁচ দিন পর আবারও বড় ধরনের পরাঘাত (আফটারশক) অনুভূত হয়েছে। এ সময় আতঙ্কিত  বাসিন্দারা ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। গত সপ্তাহের ওই বিপর্যয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৭১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ। এ পরিস্থিতিতে দেশটিতে এখন চরম মানবিক সংকট বিরাজ করছে।

গত সোমবার ভোরে আঘাত হানা ওই পরাঘাতের তীব্রতা ছিল ৪ দশমিক ৬। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা এ তথ্য জানিয়েছে। অবশ্য কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বলছে, এর তীব্রতা ছিল ৫ দশমিক ১। রাজধানী কারাকাস ও বিধ্বস্ত বন্দরনগরী লা গুইরা এ সময় কেঁপে ওঠে। লা গুইরার ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিতদের উদ্ধারে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা।

ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির নেতা হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, এই পরাঘাতে নতুন করে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে মাটির কম্পন আর ভূমিকম্পের সতর্কসংকেত শুনে কারাকাস ও লা গুইরার বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

কারাকাসের এল হাতিলো এলাকার বাসিন্দা আমারেলিস মেন্দোজা বলেন, ‘আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। কাঁপুনিতে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায়। আগের অন্য পরাঘাতগুলো টের না পেলেও আজকের কম্পনটি গত বুধবারের ভূমিকম্পের মতোই শক্তিশালী মনে হয়েছে।’

এই পরাঘাতে রাজধানীর আলতামিরা ও সান বার্নার্দিনো এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মানুষ অস্থায়ী আশ্রয়শিবির ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল। নতুন করে ভবনধসের ভয়ে অনেকে অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে বা ফুটপাতে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটাচ্ছেন।

বারবার পরাঘাতে কারাকাস মেট্রোর অবকাঠামো ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছে। অবকাঠামোর আরও ক্ষতির আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু লাইন আবারও বন্ধ করে দিয়েছে।

সান বার্নার্দিনোতে গত সপ্তাহের ভূমিকম্পে ২২ ইউনিটের ‘রিটা’ অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। সোমবারের কম্পনের পর সেখানে উদ্ধারকাজ প্রায় দেড় ঘণ্টার জন্য স্থগিত রাখা হয়।

নতুন সপ্তাহ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর কিছু দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে। তবে মানবিক সংকট গভীর হওয়ায় পার্ক ও গণচত্বরগুলোয় আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ১০ হাজার লাশের ব্যাগ দেবে বলে জানিয়েছে। তবে তারা আশা করছে, নিহতের সংখ্যা যেন এত বেশি না হয়।

ভেনেজুয়েলায় নিযুক্ত জাতিসংঘের সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোল্লা দেল তিন্দারো সরকারি তথ্যের বাইরে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে তিনি বলেন, ‘নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যে জানানো তথ্যের চেয়ে নিশ্চিতভাবেই বেশি হবে।’

তিন্দারো আরও বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা মনেপ্রাণে আশা করছি, নিহতের সংখ্যা যেন ওই সংখ্যার (১০ হাজার) চেয়ে কম হয়।’

আন্তর্জাতিক মহলের সহায়তার প্রশংসাও করেন তিন্দারো। তিনি জানান, ২৭টি দেশ থেকে ২ হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী এবং ১৬০টির বেশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর উদ্ধারকাজে পাঠানো হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার দুটি প্রধান বন্দরের একটি মেরামত করেছে মার্কিন নৌবাহিনী (ইউএস মেরিনস)। এখন সেখান দিয়ে প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ‘লা গুইরা বন্দরটি সচল হয়েছে। সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ফোর্ট লডারডেল বন্দরটি ব্যবহার করছে।’

কারাকাস ও এর আশপাশের এলাকা থেকে আসা কয়েক শ বাস্তুচ্যুত পরিবার রাজধানীর পূর্ব দিকের ২০০ একর আয়তনের ‘পার্কে দেল এস্তে’ পার্কে আশ্রয় নিয়েছে।

কারাকাসের বেলো ক্যাম্পো এলাকার বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী কাতিউস্কা আসুয়াজে চার সন্তান নিয়ে ঘর ছেড়েছেন। তিনি বলেন, ‘যেকোনো কিছুর চেয়ে জীবনের দাম বেশি।’

আসুয়াজো আরও বলেন, ‘ছাদের একটি পলেস্তারা আগেই খসে পড়েছিল। আমরা চাচ্ছিলাম না মাথার ওপর বাড়িটি ধসে পড়ুক। তাই চলে এসেছি।’

কারাকাসের পশ্চিমে ৩৬ বছর বয়সী মারিউরি পেরেজ ও ৪০ বছর বয়সী জাইমে ব্লাঙ্কোর ঘরটি ধসে পড়েছে। তাঁদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।

পেরেজ বলেন, ‘আমাদের এখন একটি তাঁবু বা ঘুমানোর জন্য অন্তত একটি গদি প্রয়োজন। প্রতিবেশীরা আমাদের খাবার দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের ঘুমানোর কোনো জায়গা নেই।’

গত বুধবার দেশটিতে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ তীব্রতার জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে। দেশি–বিদেশি উদ্ধারকর্মীরা যখন ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত ব্যক্তিদের খুঁজছিলেন, ঠিক তখনই নতুন করে পরাঘাতটি অনুভূত হলো।

গত রোববার লা গুইরা রাজ্যে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক ব্যক্তি ও তাঁর কিশোর ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় উদ্ধারকর্মীদের মধ্যে কিছুটা আশার আলো দেখা দেয়।

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, ‘আমরা আজকেও জীবিত মানুষ উদ্ধার করেছি। তাই এই উদ্ধার তৎপরতা বন্ধ হবে না।’

তবে জীবিত মানুষ পাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এল সালভাদর থেকে আসা এক উদ্ধারকর্মী এএফপিকে বলেন, ‘এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে হয়তো কেবল লাশই পাওয়া যাবে। তবে আমরা আশা ছাড়ছি না। ভাগ্য ভালো থাকলে হয়তো কাউকে জীবিতও পেতে পারি।’

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে ৫ হাজার ৩৪ জন আহত হয়েছেন। প্রায় ৮০০ ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে উদ্ধারকাজে ধীরগতি ও পূর্বপ্রস্তুতির অভাব নিয়ে সরকারের সমালোচনা হচ্ছে।

উদ্ধারকাজের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ৭২ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। এখনো হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ। এর মধ্যে লাখ লাখ মানুষ স্যানিটেশনসহ মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।