সওজে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ: অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া, ঠিকাদার নির্বাচন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার সময় তিনি একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন।

এ বিষয়ে মো. আব্দুল হান্নান নামে একজন ব্যক্তি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি নিজেকে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নিয়মিত ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, কক্সবাজার সড়ক বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণে অস্বাভাবিক হিসাব দেখানোর মাধ্যমে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে আরও দাবি করা হয়, উপকূলীয় ও পর্যটন এলাকার সড়ক উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ করা অর্থের কিছু অংশ প্রকৃত কাজের সঙ্গে মিল না রেখে বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ছাড় করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, রাজশাহী জোনে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকার সময় মো. মনিরুজ্জামান কয়েকজন নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী তৈরি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, ওই গোষ্ঠীর বাইরে থাকা অনেক ঠিকাদার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিলেও কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখে পড়তেন।

মুন্সিগঞ্জ সড়ক বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে সড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ নিয়েও অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্পে বড় অঙ্কের টাকা খরচ দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় কাজের মান সন্তোষজনক ছিল না। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই কিছু সড়কে ক্ষতি দেখা দেয় এবং জনগণ ভোগান্তিতে পড়ে।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, রংপুর জোনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় ‘আমিনুল ইসলাম কনস্ট্রাকশন’সহ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, সরকারি ক্রয় নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে এমন কিছু শর্ত তৈরি করা হতো, যাতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সুবিধা পায়।

বর্তমান দায়িত্বে থেকেও প্রকল্প অনুমোদন, কারিগরি বিষয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশন ছাড়া ফাইল অনুমোদন না করার অভিযোগ উঠেছে মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার একটি ব্যবস্থা চালু ছিল।

সওজের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, কিছু কর্মকর্তার কারণে অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র সরকারি উন্নয়ন কাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি ও অর্থ অপচয়ের অভিযোগ আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন গবেষণায় সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে দরপত্র, বিল অনুমোদন এবং কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। গবেষকদের মতে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে বড় প্রকল্পগুলোতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।

এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন কর্মকর্তা জানান, মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ কমিশনে রয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে তার সম্পদের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। যাচাই শেষে নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগের বিষয়ে মো. মনিরুজ্জামানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি প্রথমে ফোন কেটে দেন। পরে আবার যোগাযোগ করা হলে পরে কথা বলবেন বলে জানান। এরপর তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসানের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুদকের তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে। তদন্ত শেষে অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।