ফ্যাসিবাদের দোসর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি সাচ্চুর ক্যাশিয়ার খ্যাত জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে গৃহকর্মী কুমু বেগমকে ১৯ বছর গৃহবন্দি রেখে নির্যাতনের অভিযোগ ও মামলা; সংবাদ সম্মেলনে গৃহকর্মীর ন্যায়বিচারের আকুতি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ফ্যাসিবাদের দোসর তৎকালীন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চুর ক্যাশিয়ার ও অত্যন্ত কাছের মানুষ মোঃ জাহাঙ্গীর লতিফ। সাচ্চুর বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজের সাথে এই জাহাঙ্গীর জড়িত। সাচ্চু পালিয়ে গেলেও জাহাঙ্গীর ধরা ছোয়ার বাইরে।

দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে গৃহকর্মী হিসেবে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন, বিনা বেতনে কাজ করানো, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলে অভিযুক্ত মোঃ জাহাঙ্গীর লতিফের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কুমু বেগম। রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের জীবনের দীর্ঘ কষ্টের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। একই সঙ্গে তিনি প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাঙ্গীর লতিফ একপর্যায়ে তার ওপর যৌন নির্যাতন চালান। ভয় ও অসহায়ত্বে তিনি এতদিন বিষয়টি প্রকাশ করতে পারেননি। তিনি দাবি করেন, বছরের পর বছর শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সামান্য ভুলের জন্যও তাকে মারধর, অপমান এবং ভয়ভীতি দেখানো হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, জাহাঙ্গীর লতিফের দুই মেয়ে জেবা রাইসা ও দিয়া রাইসাও বিভিন্ন সময় তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করতেন। কুমু বেগমের দাবি, জাহাঙ্গীর লতিফের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তার ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। পরিবারের কয়েকজন সদস্য মিলে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতেন যাতে তিনি নিজেই বাসা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।

কুমু বেগম জানান, বিয়ের বয়স হলে তার বিয়ের সব খরচ বহনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে সেই প্রতিশ্রুতি রাখা হয়নি। বরং ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই তাকে কোনো অর্থ, নিরাপত্তা বা ভবিষ্যতের ব্যবস্থা না করেই চট্টগ্রামগামী একটি বাসে তুলে দিয়ে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে আদালতের মাধ্যমে মামলা করা হয়। মামলায় বলা হয়েছে, ১৯ বছরের বকেয়া বেতন (মাসিক ৩,০০০ টাকা হিসাবে) ৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা এবং বিয়ের খরচ বাবদ প্রতিশ্রুত ২ লাখ টাকাসহ মোট ৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে। মামলার নম্বর ১০৬/২০২৬। যা এখন কাফরুল থানার তদারকিতে রয়েছে।

কুমু বেগমের অভিযোগ, জাহাঙ্গীর লতিফ বর্তমানে উত্তর ইব্রাহিমপুরে নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। তার নামে একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে এসব সম্পদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো যাচাইয়ের তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।

মামলায় জাহাঙ্গীর লতিফের বিরুদ্ধে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কুমু বেগম অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর বর্তমানে বিভিন্ন বিএনপি নেতাদের নাম ব্যবহার করে তাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন এবং নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করছেন। এবং তার সাথে বিএনপির বড় নেতা ও পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে সখ্যতার কথা সবাইকে বলে বেড়ান ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে নানা ধরণের অনৈতিক কাজ করে থাকেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, মিলন নামে জাহাঙ্গীর লতিফের এক সহযোগী দীর্ঘদিন ধরে তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সহায়তা করে আসছেন এবং তার একান্ত সহকারী ও ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া জাহাঙ্গীর লতিফকে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের আর্থিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আছেন। আরও দাবি করা হয়, ২০২৪ এর ৫ আগস্ট মিরপুরে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। তবে এসব রাজনৈতিক অভিযোগের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত মোঃ জাহাঙ্গীর লতিফ, তার সহযোগী মিলন এবং গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চুর বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত, ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান।