৬ কোটি টাকার ঘুষে পিডি নিয়োগের অভিযোগ, এলজিইডির ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার ‘ইমপ্রুভিং আরবান গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রোগ্রাম (আইইউজিআইপি)’ প্রকল্পকে ঘিরে নতুন করে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে তোফায়েল আহমেদকে নিয়োগ দিতে প্রায় ৬ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগটি করেছেন মোহাম্মদ আলী নামে এক ব্যক্তি।

লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এলজিইডির গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে এখনো আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তারা বহাল রয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদকে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আইইউজিআইপি প্রকল্পের পরিচালক করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এর আগে তোফায়েল আহমেদকে একই প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে দাতা সংস্থা আপত্তি তোলে। পরে প্রকল্পের অভিজ্ঞ পরিচালক মো. আব্দুল বারেককে দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু এবার হঠাৎ করেই তাকে সরিয়ে তুলনামূলক জুনিয়র কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দেশের ৮৮টি পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নেওয়া এই বৃহৎ প্রকল্পটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

অভিযোগে তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়েও গুরুতর দাবি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নওগাঁয় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে প্রায় চার বছর দায়িত্ব পালনকালে তিনি তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নকাজে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থের মালিক হন। অভিযোগ অনুযায়ী, নিজের নামে এবং স্ত্রী দিলরুবা হোসেনসহ পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি, গাড়ি এবং ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ গড়ে তুলেছেন তিনি। এসব সম্পদের বেশিরভাগই তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি উঠেছে রাস্তা নির্মাণকাজে অনিয়ম নিয়ে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় থ্রি-আরসিসি সড়ক নির্মাণে ১২ ইঞ্চি পুরু ঢালাই এবং প্রতি ৪ ইঞ্চি পরপর রড ব্যবহারের নকশা ও নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে মাত্র ৬ ইঞ্চি ঢালাইয়ের মাধ্যমে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে রাস্তার স্থায়িত্ব ও মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এই অনিয়মের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাছ থেকে তোফায়েল আহমেদ প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বা ঘুষ আদায় করছেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এলজিইডিতে বর্তমানে ঘুষ, বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অন্তত ১১ জন বিতর্কিত প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সিনিয়র কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে জুনিয়রদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং পদোন্নতি, বদলি কিংবা ভালো পদায়নের ক্ষেত্রেও ঘুষ ছাড়া কিছুই হচ্ছে না বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে এখনো প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ, দক্ষ ও যোগ্য প্রকৌশলীরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগকারীর বক্তব্য।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় অর্থ এবং বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের আশঙ্কা রয়েছে। তাই পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালক তোফায়েল আহমেদ। এ বিষয়ে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং এগুলোর কোনো সত্যতা নেই।