এলেনবাড়ি গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে অনিয়মের অভিযোগ: নির্বাহী প্রকৌশলী ড. শফিউল ইসলামকে ঘিরে ক্ষোভ, টেন্ডার ও সংস্কার কাজে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকার তেজগাঁওয়ের এলেনবাড়ি এলাকায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের সম্পদ বিভাগে নানা ধরনের অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি ও টেন্ডার কারসাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সম্পদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মো. শফিউল ইসলাম। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সরকারি বাসভবনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে। বিভাগটির একাধিক নিবন্ধিত ঠিকাদার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব অভিযোগ তুলে ধরে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন সরকারি বাসভবনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে প্রায় ৮ কোটি টাকার কাজ দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে কাজ শেষ হওয়ার আগেই কিংবা কাজ না করেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে। পরে সেই অর্থ ভাগাভাগি করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী ড. শফিউল ইসলাম, সহকারী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম, উপসহকারী প্রকৌশলী সুশান্ত দত্ত এবং সম্পদ বিভাগের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে। অভিযোগে স্টাফ অফিসার এবং অফিস সহকারী-কাম-এস্টিমেটরদের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, ড. শফিউল ইসলাম সম্পদ বিভাগে যোগ দেওয়ার পর থেকেই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্বাচিত কিছু ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় এবং অন্য ঠিকাদারদের বিভিন্ন অজুহাতে টেন্ডার থেকে বাদ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডারের শর্ত এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ কার্যত প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে না পারে। ফলে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও অনেক ঠিকাদার কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বিশেষ করে চলতি বছরের ৪ মে আহ্বান করা সুইমিং পুল মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের একটি টেন্ডার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাধিক ঠিকাদার। তাদের দাবি, এই টেন্ডারের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই সুবিধা পায়। প্রায় ২৫ জন নিবন্ধিত ঠিকাদার এই প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বাদ পড়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া এলেনবাড়ি এলাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত ১ নম্বর ও ২ নম্বর ভবনের সংস্কার কাজ নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৬০ লাখ টাকার সংস্কার কাজের বিল দেখানো হলেও বাস্তবে তেমন কোনো কাজ হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১ নম্বর ভবনের এক বাসিন্দা, যিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলে পরিচয় দিয়েছেন, দাবি করেন গত দুই বছরে ভবনটিতে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার কাজ চোখে পড়েনি। অথচ সরকারি নথিতে এসব কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দেখিয়ে বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ১২ মে ২০২৬ প্রকাশিত আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগসংক্রান্ত টেন্ডার। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই নিয়োগ প্রক্রিয়াও আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল এবং একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা।

এদিকে কয়েকজন ঠিকাদার আরও অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ৭ নম্বর ওয়ার্ড তেজকুনিপাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং মা এন্টারপ্রাইজের মালিক জামাল হোসেন এখনও সম্পদ বিভাগে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। তাদের দাবি, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জামাল হোসেনকে বিভিন্ন কাজ পাইয়ে দিতে নির্বাহী প্রকৌশলী ড. শফিউল ইসলাম এবং সহকারী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডারের প্রাক্কলন ও অন্যান্য শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয় যাতে মা এন্টারপ্রাইজ সুবিধা পায় এবং অন্য ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতা করতে না পারেন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ বা কমিশনের দাবি পূরণ করতে না পারলে অনেক ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয় না। বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও তারা টেন্ডারে সুযোগ পান না। বিপরীতে ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ঠিকাদারদের ভাষ্য, এভাবে কমিশন বাণিজ্য এবং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে এবং একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সুবিধা ভোগ করছে।

এছাড়া অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে দায়িত্ব পালন করা হলেও বর্তমানে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে একই ধরনের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে টেন্ডার কারসাজি, সংস্কার কাজের অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য এবং জনবল নিয়োগে সিন্ডিকেটের প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মো. শফিউল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে জানান, তিনি একটি বৈঠকে ব্যস্ত আছেন এবং পরে কথা বলবেন। এরপর আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের স্বার্থে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।