সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগ
বিশেষ প্রতিবেদকঃ সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন শাখার সদ্য সাবেক উপপরিচালক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার এবং আয়কর ফাঁকির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া একটি অভিযোগে এসব তথ্য তুলে ধরে তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, পটুয়াখালীতে বদলি হলেও তিনি সেখানে যোগদান না করে এখনও প্রধান কার্যালয়ে অবস্থান করছেন এবং প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ধরনের তদবির বাণিজ্যে জড়িত রয়েছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি চাকরির বেতনের সঙ্গে আইয়ুব খানের বর্তমান সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই। একজন ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে মাসিক প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা বেতন পেলেও তিনি নামে-বেনামে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, নিবন্ধিত সংস্থাগুলোর ফাইল আটকে ঘুষ আদায়, অনুদান বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজধানীর শ্যামলীর ঢাকা গার্ডেন সিটিতে আইয়ুব খানের নামে ও ঘনিষ্ঠজনদের নামে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। হাসনাহেনা (এফ) টাওয়ারে একটি ফ্ল্যাট ও পার্কিং তার নিজের নামে রয়েছে। আরও একটি ফ্ল্যাট সমাজসেবা অধিদপ্তরের নরসিংদী জেলার উপপরিচালক মাসুদুল হাসান তাপসের নামে এবং আরেকটি তার জাপানপ্রবাসী ভাগ্নে মো. সোহেল রানার নামে কেনা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া একই আবাসিক প্রকল্পের মাধবীলতা (বি+সি) টাওয়ারেও তার আরও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, প্রতিটি ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা।
শুধু রাজধানীতেই নয়, নিজ জেলা কুমিল্লার হোমনায়ও আইয়ুব খানের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সেখানে মার্কেট, বিলাসবহুল বাংলো, খামারবাড়ি এবং বিভিন্ন স্থাবর সম্পদের পাশাপাশি কয়েক কোটি টাকা মূল্যের একাধিক ব্যক্তিগত গাড়ি কিনে ভাড়ায় পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ এফডিআর এবং ঢাকা গার্ডেন সিটিতে আরও একটি প্লট কেনার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে কানাডায় পাচার করা হয়েছে। সেখানে বাড়ি কেনার অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের প্রকৃত সম্পদের তথ্য আয়কর নথিতে গোপন রেখে দীর্ঘদিন ধরে আয়কর ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আইয়ুব খান ঢাকা ও কুমিল্লার হোমনায় একাধিক কাগুজে বা অস্তিত্বহীন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তুলে বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে সরকারি অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। হোমনার শ্যামপুর এলাকার সুরাইয়া-খালেক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন নামে সংগঠন তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন ও নিবন্ধনসংক্রান্ত ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রেখে ঘুষ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতাকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা আদায় করেছেন এবং সেই অর্থে নিজের ও আত্মীয়-স্বজনের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। এমনকি নিজের সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আড়াল করতে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, সহকর্মী ও সিন্ডিকেটের সদস্যদের নামও ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা গার্ডেন সিটিতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন জেলার কর্মকর্তাদের নামে অন্তত ১৫টি ফ্ল্যাট রয়েছে এবং এসব সম্পদের দেখভালের দায়িত্বও আইয়ুব খানই পালন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস ও অর্থের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতির পরিচালনা পর্ষদকে ঘিরেও আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সমিতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও প্রশাসক নিয়োগ না দিয়ে অবৈধ পরিচালনা পর্ষদকে সুবিধা দিতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এ কাজে আইয়ুব খানের সঙ্গে ঢাকা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক রকনুল হকের যোগসাজশ ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২২ সালে জমা দেওয়া একটি আবেদনকে ভিত্তি করে দুই বছর পর নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অথচ এর আগেই তদন্ত সম্পন্ন হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয়েছিল। এরপরও নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠন করে পুরো বিষয়টি দীর্ঘায়িত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একই বিষয়ে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সাংঘর্ষিক বলে অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতির বিতর্কিত পরিচালনা পর্ষদকে সহযোগিতা করতে আইয়ুব খান ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্ত প্রতিবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব করেন। পরে তিনি মতামতে উল্লেখ করেন যে, মহাপরিচালকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং ঢাকা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়কে নতুন করে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এভাবে তদন্ত প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করে বিতর্কিত পরিচালনা পর্ষদকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে আইয়ুব খানের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া সংগঠনের মাধ্যমে অনুদান গ্রহণ, অর্থপাচার, আয়কর ফাঁকি এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।