সমবায় অধিদপ্তরে অতিরিক্ত নিবন্ধক নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট গড়ে শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
বিশেষ প্রতিবেদকঃ সমবায় সমিতির নিবন্ধন, তদারকি, আইনগত সহায়তা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা সমবায় অধিদপ্তরের। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠতে থাকায় অধিদপ্তরটির কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব অনিয়মের কারণে সাধারণ সমবায়ী ও সেবাগ্রহীতারা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
এমন অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সমবায় অধিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধক (প্রশাসন, মাসউ ও ফাইন্যান্স) মো. নবীরুল ইসলাম। ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাকরিজীবনের শুরু থেকেই বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অধিদপ্তরের ভেতরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে বদলি, পদোন্নতি, সমিতির নিবন্ধন, লাইসেন্স অনুমোদন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সুবিধা আদায় করে আসছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় নবীরুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কোটার অপব্যবহার করেছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি সমবায় অধিদপ্তরে যোগদানের আগে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) কর্মরত ছিলেন এবং সেখানে দায়িত্ব পালনরত এক কর্মকর্তার সহযোগিতায় বিসিএস পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে তার বাবা মৃত মো. সহিদুল ইসলামকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেখিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০০১ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর কাফরুল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পরে বিষয়টি তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের ভিত্তিতে ২০০২ সালের ১৫ জুন তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলেও পরবর্তীতে প্রভাব খাটিয়ে তিনি সেই জটিলতা কাটিয়ে আবার চাকরিতে বহাল হন।
এছাড়া ২০১১ সালে সিরাজগঞ্জে উপ-নিবন্ধক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সিরাজগঞ্জ কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের ছয় শতক জমি বিক্রির ঘটনায় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত ও মামলার মুখোমুখি হলেও সেই তথ্য গোপন রেখেই তিনি পরবর্তীতে পদোন্নতি নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে নবীরুল ইসলাম অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তার করেন। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য, ঘুষ গ্রহণ, সমিতির নিবন্ধন ও লাইসেন্স অনুমোদনের নামে অর্থ আদায় এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান সময়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রেখেই তিনি অতিরিক্ত নিবন্ধক পদে পদোন্নতি নিয়েছেন।
সমবায় অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে একাধিক অভিযোগ ও তথ্য জমা থাকলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে তারা দাবি করেছেন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০১২ সালে রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে বন্ধক রাখা জমির ওপর অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ করে দিয়ে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা পাইয়ে দেন নবীরুল ইসলাম। এতে সমবায় অধিদপ্তর এবং সরকারের সম্পদের ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই সময়ের বিভাগীয় যুগ্ম নিবন্ধক অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাকেও লাঞ্ছিত করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এছাড়াও বিভিন্ন সমবায় সমিতির নিবন্ধন, পরিদর্শন, তদন্ত প্রতিবেদন, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং অন্যান্য দাপ্তরিক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় অধিদপ্তরের স্বাভাবিক প্রশাসনিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সাধারণ সমবায়ীরা ন্যায্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো.নবীরুল ইসলাম এর সাথে যোগাযোগের জন্য কল করা হলে রিসিভ করেননি।