ডিজিটাল নম্বর প্লেটের নামে ১,৫১৬ কোটি টাকা আদায়, ১৪ বছরেও মিলল না প্রতিশ্রুত সেবা
বিশেষ প্রতিবেদকঃ চুরি যাওয়া গাড়ি শনাক্ত, অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহনের গতিবিধি অনুসরণ এবং সেতু ও মহাসড়কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালে ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (আরএফআইডি) ব্যবস্থা চালু করেছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। প্রায় ১৪ বছর ধরে এ ব্যবস্থার আওতায় অর্ধকোটির বেশি যানবাহন মালিকের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে ১ হাজার ৫১৬ কোটি টাকার বেশি।
তবে বিপুল অর্থ আদায়ের পরও বাস্তবে মিলছে না প্রকল্পটির ঘোষিত সুবিধা। চুরি যাওয়া গাড়ি শনাক্ত বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যানবাহনের গতিপথ অনুসরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। এমনকি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যে চেকপোস্ট স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল, তার বড় অংশও বাস্তবায়ন হয়নি।
এর মধ্যেই আগের ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে নতুন করে গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। আগামী দিনের এই ব্যবস্থাও আগের আরএফআইডি প্রকল্পের মতো অব্যবহৃত হয়ে পড়বে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
২০১২ সালে যাত্রা, বড় প্রত্যাশা
২০১২ সালের ৩১ অক্টোবর সব ধরনের যানবাহনের জন্য ডিজিটাল নম্বর প্লেট বাধ্যতামূলক করে বিআরটিএ। তখন বলা হয়েছিল, প্রতিটি গাড়িতে নম্বর প্লেটের পাশাপাশি আরএফআইডি ট্যাগ থাকায় চুরি হয়ে যাওয়া গাড়ি শনাক্ত করা সহজ হবে। কোনো যানবাহন অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার হলেও প্রযুক্তির মাধ্যমে সেটির অবস্থান ও গতিপথ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বিভিন্ন সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে আরএফআইডি প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় টোল আদায়ের পরিকল্পনাও ছিল।
তৎকালীন নির্ধারিত হিসাবে মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানবাহনের ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগের জন্য ২ হাজার ২৬০ টাকা এবং চার চাকার যানবাহনের জন্য ৪ হাজার ৬২৮ টাকা নেওয়া হয়।
৫৪ লাখের বেশি প্লেট, আদায় ১,৫১৬ কোটি টাকা
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির যানবাহনের জন্য ৫৪ লাখ ৭১ হাজার ৪৮৯টি আরএফআইডি ট্যাগযুক্ত ডিজিটাল নম্বর প্লেট সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ লাখ ৭০ হাজার ৮৬৯টি নম্বর প্লেট যানবাহনে সংযোজন করেছেন মালিকরা। আরও ৫ লাখ ৬২০টি প্লেট বিভিন্ন সার্কেল অফিসে পড়ে আছে।
এসব নম্বর প্লেটের বিপরীতে যানবাহন মালিকদের কাছ থেকে মোট ১ হাজার ৫১৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা আদায় করেছে বিআরটিএ।
এর মধ্যে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৪৪টি ভারী যানবাহন থেকে আদায় হয়েছে ১১৫ কোটি ১১ লাখ ৮৭ হাজার ২৩২ টাকা। ৯ লাখ ৩৩ হাজার ২৮৭টি হালকা ও মধ্যম শ্রেণির যানবাহন থেকে নেওয়া হয়েছে ৪৩১ কোটি ৯২ লাখ ৫২ হাজার ২৩৬ টাকা।
সবচেয়ে বেশি অর্থ এসেছে মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানবাহন থেকে। ৪২ লাখ ৮৯ হাজার ৪৫৮টি এসব যানবাহনের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯৬৯ কোটি ৪১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
অধিকাংশ মালিকই জানেন না আরএফআইডির কাজ
ডিজিটাল নম্বর প্লেটের সঙ্গে আরএফআইডি প্রযুক্তি থাকলেও এর কার্যকারিতা সম্পর্কে অনেক যানবাহন মালিকই অবগত নন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের ১৪ জন মালিকের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে মাত্র একজন ছাড়া অন্যরা জানেন না, গাড়িতে থাকা আরএফআইডি ট্যাগটি কী কাজে ব্যবহারের কথা।
পুরানা পল্টন এলাকায় এক মোটরসাইকেল মালিক হাফিজুর রহমান বলেন, গাড়ি কেনার পর ডিজিটাল নম্বর প্লেট নিতে হয় এবং তিনি এটিকে মূলত গাড়ির রেজিস্ট্রেশনেরই একটি অংশ হিসেবে মনে করেন।
ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসক শুব্রত মন্ডলের মোটরসাইকেল আট মাসেরও বেশি সময় আগে চুরি হয়েছে। থানায় সাধারণ ডায়েরি করার পর কয়েকবার যোগাযোগ করেও গাড়িটির সন্ধান পাননি তিনি। অথচ চুরি যাওয়া গাড়ি শনাক্ত ও উদ্ধারে সহায়তা করাই ছিল আরএফআইডি ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।
৯৪টি চেকপোস্টের পরিকল্পনা, হয়েছে মাত্র ১২টি
ডিজিটাল নম্বর প্লেট প্রকল্পের আওতায় শুরুতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ৯৪টি স্থানে চেকপোস্ট স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। এসব চেকপোস্টের মাধ্যমে আরএফআইডি ট্যাগ শনাক্ত করে সন্দেহজনক বা চুরি যাওয়া গাড়ির বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।
কিন্তু ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১২টি চেকপোস্ট। সবগুলোই ঢাকার মধ্যে। এসব কেন্দ্র নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পৃথক জনবলও নিয়োগ করতে পারেনি বিআরটিএ।
ফলে সারাদেশে বিপুলসংখ্যক গাড়িতে প্রযুক্তিটি যুক্ত থাকলেও সেটিকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর মতো ব্যবস্থা তৈরি হয়নি।
পরিকল্পনায় ছিল আরও অনেক সুবিধা
ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা ছিল শুধু গাড়ির পরিচয় নিশ্চিত করা নয়; বরং একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিবহন ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আরএফআইডির মাধ্যমে কোনো গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা সম্ভব হওয়ার কথা। নম্বর প্লেট রাতে প্রায় ৪০ ফুট দূর থেকেও দৃশ্যমান এবং আরএফআইডি চিপ প্রায় ১১ মিটার দূর থেকে স্ক্যান করা যাবে—এমন প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কথাও বলা হয়েছিল।
এসব তথ্য বিআরটিএর কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষিত থাকার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থাও করার কথা ছিল।
বাস্তবে সেই সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় আরএফআইডির সম্ভাবনা অনেকটাই কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
পুলিশের সঙ্গে নেই সরাসরি ডিজিটাল সংযোগ
প্রকল্প শুরুর প্রায় ১৪ বছর পরও বিআরটিএর কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে পুলিশের কার্যকর ডিজিটাল সংযোগ স্থাপিত হয়নি। ফলে আরএফআইডি ব্যবহার করে পুলিশ চুরি যাওয়া গাড়ি বা অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহন শনাক্ত করার সুযোগ পাচ্ছে না।
পুলিশকে নিজস্ব প্রযুক্তি, তথ্যসূত্র ও প্রচলিত তদন্ত পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেই গাড়ি চুরি ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. নিয়াজ মেহেদী বলেন, আরএফআইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করা না যাওয়ায় পুলিশ নিজস্ব প্রযুক্তি ও তথ্যসূত্র কাজে লাগিয়ে অপরাধ দমন এবং চুরি যাওয়া গাড়ি উদ্ধারের চেষ্টা করে। বিআরটিএর মাসিক প্রতিবেদন থেকে মূলত ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
এবার গণপরিবহনে বাধ্যতামূলক জিপিএস
ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডির কাঙ্ক্ষিত সুফল নিশ্চিত না হওয়ার মধ্যেই গণপরিবহনে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ গত ১১ জুন জিপিএস ডিভাইস ব্যবহারের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে ১ আগস্ট থেকে গণপরিবহনে জিপিএস ডিভাইস সংযোজন এবং সেটি সচল রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিআরটিএ জানিয়েছে, নির্ধারিত কারিগরি বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী জিপিএস ডিভাইস স্থাপন করতে হবে। ডিভাইস সংযুক্ত ও কার্যকর থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই গণপরিবহনের রেজিস্ট্রেশন এবং ফিটনেস সনদ দেওয়া বা নবায়ন করা হবে।
নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং গণপরিবহনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিআরটিএর দাবি, সুফল মিলবে
বিআরটিএর উপপরিচালক ফারুক হোসেন বলেন, গত ১৪ বছরে প্রায় অর্ধকোটি যানবাহনে ডিজিটাল নম্বর প্লেট সংযোজন করা হয়েছে। দীর্ঘ সময়ের এ কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছে এবং এখন এর সুফল পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব না হওয়ার পেছনে জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিদ্যমান জনবল দিয়েই সার্ভার মনিটরিংসহ বিভিন্ন কাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির ডিজিটাল নম্বর প্লেট বিভাগের প্রজেক্ট ম্যানেজার মেজর রেজাউল ইসলাম বলেন, এ ব্যবস্থার সঙ্গে একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ জড়িত। প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে জনগণ এর সুফল পাবেন। তাঁর দাবি, বিএমটিএফের ওপর অর্পিত দায়িত্ব অনুযায়ী ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে।
নতুন জিপিএস উদ্যোগেও পুরোনো ভুলের আশঙ্কা
পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল ইতিবাচক। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি না করায় জনগণ এর সুফল পায়নি।
তিনি বলেন, অনেক গাড়িতে আরএফআইডি ট্যাগ বসানো হলেও স্বয়ংক্রিয় টোল আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় স্থানে রিডার স্থাপন করা হয়নি। ফলে প্রযুক্তি থাকার পরও সেটি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে প্রথম দিকে স্থাপন করা অনেক আরএফআইডি ট্যাগ বর্তমানে কার্যকর আছে কি না, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।
তাঁর মতে, গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার চালুর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো যায়। তবে আগের প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার শুরুতেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, তথ্য ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তা না হলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে চালু করা নতুন জিপিএস ব্যবস্থার পরিণতিও পুরোনো আরএফআইডি প্রকল্পের মতো হতে পারে—প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেবা পৌঁছাবে না জনগণের কাছে।