গণপূর্তে লটারিভিত্তিক গণবদলি নিয়ে ক্ষোভ: নীতিমালার ব্যত্যয় ও কেপিআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

বিশেষ প্রতিনিধি: গণপূর্ত অধিদপ্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলে লটারির মাধ্যমে গণবদলি প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ—অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও ব্যক্তিগত বাস্তবতাকে গুরুত্ব না দিয়ে স্রেফ লটারির ভিত্তিতে পদায়নের ফলে অধিদপ্তরে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) ও ভিআইপি এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কায় চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিতর্কিত কিছু পোস্টিং পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

  • ধাপে ধাপে গণবদলি

অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ৩০ জুলাই প্রথম দফায় ৭৬৭ জন সিভিল উপসহকারী প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়। এরপর ৩ আগস্ট ইলেকট্রিক ও মেকানিক্যাল (ই/এম) শাখার ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে একইভাবে পদায়ন করা হয়।

সিভিল বিভাগ: ঢাকা বিভাগে ৩১৭ জন, চট্টগ্রামে ১৩৩, রাজশাহীতে ৭৩, খুলনায় ৭৪, বরিশালে ৪৪, সিলেটে ৩৩, ময়মনসিংহে ২৯ এবং রংপুরে ৬৪ জন।

ই/এম শাখা: ঢাকা বিভাগে ১১৯ জনসহ অন্যান্য বিভাগে কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়।

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, ১১ আগস্ট সহকারী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের এবং চলতি মাসের শেষ নাগাদ নির্বাহী প্রকৌশলীদেরও লটারির মাধ্যমে বদলি করার কথা রয়েছে।

  • নীতিমালার ব্যত্যয় ও মানবিকতার অবহেলা

বদলীকৃত প্রকৌশলীদের একাংশের দাবি, এই গণবদলি প্রক্রিয়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের ‘কর্মকর্তাদের বদলি/পদায়ন নীতিমালা ২০২৫’-এর সরাসরি লঙ্ঘন। নীতিমালায় একই কর্মস্থলে তিন বছর (বিশেষ ক্ষেত্রে দুই বছর) দায়িত্ব পালনের স্পষ্ট বিধান থাকলেও, মাত্র এক মাস থেকে এক বছর কর্মরত থাকা কর্মকর্তাদেরও লটারির নামে বদলি করা হয়েছে।

এছাড়া গুরুতর অসুস্থতা (যেমন ক্যানসারে আক্রান্ত স্বজনের চিকিৎসা), চাকরিজীবী স্বামী-স্ত্রীকে কাছাকাছি কর্মস্থলে রাখা এবং বিভিন্ন মানবিক ও পারিবারিক বিবেচনাগুলো এ প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে বলে ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন।

  • কেপিআই ও ভিআইপি এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা

লটারিভিত্তিক পদায়নে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা তৈরি হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কেপিআই ও ভিআইপি সেকশনগুলোকে ঘিরে। অভিযোগ উঠেছে, লটারির ফলাফলে ২০১৯ ও ২০২২ ব্যাচের বেশ কয়েকজন তরুণ ও অনভিজ্ঞ ডিপ্লোমা প্রকৌশলী এবং কার্য সহকারী বা ড্রাফটসম্যান থেকে পদোন্নতি পাওয়া উপসহকারী প্রকৌশলীদের রাষ্ট্রের সংবেদনশীল স্থাপনায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

যেমন—একজন পদোন্নতিপ্রাপ্ত নারী প্রকৌশলীকে গুলশানের ভিআইপি সেকশনে এবং গোপালগঞ্জের বাসিন্দা উপসহকারী প্রকৌশলী নিমিতোষ ওঝাকে গুলশানে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের মতে, পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ও সঠিক প্রাক্কলন (ইস্টিমেট) তৈরির দক্ষতা না থাকলে এসব এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হবে। পাশাপাশি কেপিআই এলাকার দায়িত্ব বণ্টনে গোপনীয়তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

  • চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার ঝুঁকি

সংক্রান্ত কর্মকর্তাদের মতে, এমন আকস্মিক ও দূরবর্তী বদলির ফলে অধিদপ্তরের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে লটারির মাধ্যমে বদলির স্পষ্ট কোনো মানদণ্ড বা নীতিমালা নির্দেশিত না থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে বৈষম্য ও অসন্তোষ ক্রমশ দানা বাঁধছে।

  • প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ

লটারি বিতর্ক ছাড়াও গণপূর্ত অধিদপ্তরের চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরেও ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে পোস্টিং বাণিজ্য, কথিত সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, আত্মীয়দের ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়া, গোপন স্থানে দপ্তর পরিচালনা, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

  • দ্রুত পর্যালোচনার দাবি

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, বদলি নীতিমালা উপেক্ষা করে শুধু লটারির ওপর নির্ভর করায় প্রশাসনে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা জরুরি। বিশেষ করে কেপিআই এলাকার নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ স্বার্থে বিতর্কিত পদায়নগুলো দ্রুত পর্যালোচনা করা এবং প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।