গণপূর্তের ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেটে’ সাইফুর রহমানের নাম: সম্পদ, ঠিকাদারি প্রভাব ও অনৈতিক প্রস্তাবের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতাধীন সরকারি ভবন নির্মাণ, সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় হয়। স্বাভাবিকভাবেই এসব প্রকল্পের দরপত্র, কার্যাদেশ, বিল অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে পড়ে।

খুলনা গণপূর্ত জোনের কয়েকজন কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে এমনই কিছু অভিযোগের সন্ধান পেয়েছে এই প্রতিবেদক। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন খুলনা গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমান। তাঁর বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনের সময় ঠিকাদারি সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়া, কাজের বিল ও ফাইল অনুমোদনে অনৈতিক সুবিধা দাবি, ক্ষমতার প্রভাব খাটানো এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগগুলোর প্রকৃতি ও ব্যাপ্তি যাচাই করতে প্রাথমিক অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে সাইফুর রহমানের কর্মজীবন, ঠিকাদারি কার্যক্রম ঘিরে অভিযোগ এবং তাঁর নামে-বেনামে থাকা কথিত সম্পদের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

খুলনা জোনে সাইফুর রহমানের দায়িত্ব

মো. সাইফুর রহমান ১৮তম ব্যাচের প্রকৌশলী। তিনি ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি খুলনা গণপূর্ত জোনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে তিনি ঢাকার আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আজিমপুরে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সরকারি কাজের দরপত্র ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তাঁর প্রভাববলয় তৈরি হয়। সেই সময় থেকেই ঠিকাদারদের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং তাদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকল্প নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।

আজিমপুরে ‘নির্দিষ্ট ঠিকাদার’ নির্ভরতার অভিযোগ

আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে কমিশননির্ভর একটি ঠিকাদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ভাষ্য, তাঁর অনুমোদন ছাড়া বিভিন্ন ফাইল ও বিলের কাজ এগোনো কঠিন ছিল। বিশেষ করে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ ও ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

আজিমপুরে সরকারি জায়গায় অবৈধভাবে দোকান পরিচালনা এবং এসব স্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ নিয়েও আগে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সে সময় অভিযোগ অস্বীকার করে সাইফুর রহমান জানিয়েছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে কলোনিভিত্তিক কল্যাণ সমিতির নেতারাই এসব দোকান পরিচালনা করে আসছেন।

খুলনায়ও একই ধরনের অভিযোগ

খুলনা গণপূর্ত জোনে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাঁর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন কাজের বিল, ফাইল অনুমোদন এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নির্ধারিত নিয়মের বাইরে সুবিধা দেওয়ার চাপ তৈরি করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খুলনার একাধিক ঠিকাদার জানান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে কাজের ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হয় না। বিল ছাড় করাতেও নানা ধরনের অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রমাণের পূর্ণাঙ্গ যাচাই এখনও চলমান।

রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও প্রশ্ন

সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে অতীতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখার অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকায় কর্মরত থাকার সময় আলোচিত ঠিকাদার জিকে শামীম ও গোল্ডেন মনিরের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তাঁর ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। একটি সূত্রের দাবি, সে সময় তিনি আওয়ামী লীগপন্থী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং আন্দোলন দমনে অর্থসহায়তার সঙ্গেও তাঁর সংশ্লিষ্টতার কথা শোনা যায়। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নিশ্চিত ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে আসেনি।

সম্পদের বিস্তৃতি নিয়ে নানা তথ্য

সাইফুর রহমানের সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানে ঢাকার মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে দুটি বাড়ি, পূর্বাচলে প্লট এবং টাঙ্গাইলের ঘাটাইল এলাকায় একটি ডুপ্লেক্স বাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া বাজার রোড এলাকায় তিনতলা একটি মার্কেটের তথ্যও পাওয়া গেছে। ওই সম্পদ তাঁর ভাইয়ের বলে দাবি করেছেন সাইফুর রহমান—এমন তথ্যও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অন্যদিকে সালাউদ্দিন সেনানিবাস মোড় এলাকায় একটি এলপিজি ফিলিং স্টেশনের জায়গায় ‘সোনারতরী পার্ক’ এবং এর কাছাকাছি প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের জমিতে ‘কাঠবাদাম’ নামে একটি রেস্টুরেন্টের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর একটি ফ্ল্যাট রয়েছে এবং সেখানে তাঁর মেয়ে বসবাস করছেন বলে একটি সূত্র দাবি করেছে। এসব সম্পদের মালিকানা, ক্রয়মূল্য ও অর্থের উৎস যাচাইয়ের কাজ চলছে।

শতকোটি টাকার সম্পদের দাবি, অনুসন্ধান অব্যাহত

প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাইফুর রহমানের নামে, পরিবারের সদস্যদের নামে কিংবা তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে দাবি করা সম্পদের মোট মূল্য শতকোটি টাকার কাছাকাছি বা তারও বেশি হতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা এবং বৈধ-অবৈধ উৎস নির্ধারণের জন্য সরকারি নথি, সম্পদ বিবরণী ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক তথ্য যাচাই প্রয়োজন।

এ কারণে সম্পদের বিষয়ে পাওয়া তথ্যকে আপাতত অভিযোগ ও অনুসন্ধানাধীন তথ্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে সম্পদের দলিল, মালিকানা, ক্রয়মূল্য এবং আয়ের উৎস যাচাই করে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা থাকবে।

বক্তব্য জানতে গিয়ে ‘ম্যানেজ’ করার প্রস্তাবের অভিযোগ

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সাইফুর রহমানের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। সরাসরি বক্তব্য দেওয়ার পরিবর্তে তাঁর একজন প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

একই সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে সাইফুর রহমানের সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। সাইফুর রহমানের সম্পদ, ঠিকাদারি কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগের আরও তথ্য পরবর্তী পর্বে তুলে ধরা হবে।