নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ, অসম্পূর্ণ কাজেও বিল: প্রশ্নের মুখে ইইডির হাসান শওকত
বিশেষ প্রতিবেদকঃ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে। ইইডির বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে তিনি একের পর এক সুবিধাজনক পদায়ন নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হাসান শওকত নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ও বদলেছেন। একসময় আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে নিজেকে জামায়াত-শিবিরের অনুসারী হিসেবে উপস্থাপন করেন। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইইডির ঢাকা মেট্রো অঞ্চলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদে দায়িত্ব পান। বর্তমানে বিএনপির অনুসারী পরিচয়ে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলেও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
এদিকে প্রায় চার বছর আগের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে হাসান শওকতকে তার দপ্তরে কয়েকজন ঠিকাদারের সামনে বসে থাকতে দেখা যায়। টেবিলের ওপর বেশ কিছু টাকার বান্ডিলও দৃশ্যমান। অভিযোগ উঠেছে, ওই অর্থ ঘুষের টাকা। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্তে উদ্যোগ নেয়।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্তের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কেরামত আলীকে সভাপতি করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপসচিব (উন্নয়ন-৩)।
অসম্পূর্ণ কাজেও বিল পরিশোধের অভিযোগ
হাসান শওকতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি ২০১৯ সালে রাজধানীর শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের ১০তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণকে ঘিরে।
সংশ্লিষ্ট নথি ও সূত্রের দাবি, তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে হাসান শওকতের দায়িত্বকালে ভবনটির নির্মাণকাজের কার্যাদেশ পায় বিল্ডার্স-সিডব্লিউবিডি জেভি নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা লিয়াকত শিকদারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুনে নবম ও দশম তলার ছাদসহ কয়েকটি কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। কিন্তু সরেজমিনে ভবনটি আটতলা পর্যন্ত নির্মিত থাকার তথ্য পাওয়া যায় এবং নবম ও দশম তলার কাজ সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে কীভাবে ওই অর্থ ছাড় করা হলো, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির সঙ্গে ওই বিল পরিশোধের ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তিন বছরের কাজও শেষ হয়নি
মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে বিদ্যুতের লোড বৃদ্ধি, মেরামত ও সংস্কারের জন্য প্রায় ১১ লাখ ৬৮ হাজার টাকার একটি কার্যাদেশ মেসার্স মেড-ইন বাংলাদেশ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রের দাবি, ২০২২ সালে কার্যাদেশ দেওয়ার পর ২০২৩ সালে হাসান শওকতের স্বাক্ষরে প্রায় ৮ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। অথচ তিন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ সম্পন্ন হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে অবশিষ্ট প্রায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে।
কাজ শুরুর আগেই বিলের অভিযোগ
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ওয়েস্ট ধানমন্ডি ইউসুফ উচ্চবিদ্যালয়ে ছয়তলা ভবন নির্মাণের জন্য ২০২২-২৩ অর্থবছরে মেসার্স এমএসবি-এমসিবিএল জেভিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কাজ শুরু হওয়ার আগেই ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাসান শওকতের স্বাক্ষরে ১০ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ঢাকার কোতোয়ালি এলাকার আনোয়ারা বেগম মুসলিম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে কাজ না করেই প্রায় ১৯ লাখ টাকা বিল উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ইইডির বিভিন্ন প্রকল্পে ঠিকাদার নির্বাচন, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতেন হাসান শওকত। পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার পাশাপাশি কাজের অগ্রগতি যথাযথভাবে যাচাই না করেই বিল ছাড়ের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় বদলের অভিযোগ
ইইডির একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে হাসান শওকত নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করে দপ্তরে প্রভাব বিস্তার করেন। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা মেট্রো সার্কেলে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
সূত্রগুলোর আরও দাবি, ছাত্রজীবনে তার ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল। তবে চাকরিজীবনে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে নিজের পরিচয়ও পরিবর্তন করে নতুন প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইইডির সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, বর্তমানে তিনি আগের মতোই ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ঠিকাদার এখনো বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সক্রিয় রয়েছেন এবং তাদের পেছনে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী তহবিলে হাসান শওকত অর্থ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ দাবির স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য হিসেবে এসেছে।
সম্পদের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন
হাসান শওকতের বিরুদ্ধে শুধু দাপ্তরিক অনিয়ম নয়, চাকরিজীবনের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার নিজের পাশাপাশি স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনের নামে বিভিন্ন এলাকায় জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদ থাকার দাবি করা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তার স্ত্রীর নামে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বিলপাবলা-৫৭ মৌজায় ৪১২২ খতিয়ানে ১২.৫০ শতাংশ জমি, দিঘলিয়ার বয়রা-১০ মৌজায় ৩৭১৭ খতিয়ানে ১১.৭২ শতাংশ, মেহেরপুর সদর উপজেলার মেহেরপুর-৬৬ মৌজায় ৫০৬২ খতিয়ানে ১৩.৮৫ শতাংশ এবং একই মৌজায় ৯৯৪২ খতিয়ানে ৮ শতাংশ জমি রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া মাগুরা সদর উপজেলার মাগুরা-৬৯ মৌজায় ৮০০২ খতিয়ানে ১৯ শতাংশ জমি এবং মেহেরপুর সদর উপজেলার একই এলাকায় ১৪০৪৫ খতিয়ানে ৬৫ শতাংশ ও ১৫৪২৯ খতিয়ানে ৪০.৩৭ শতাংশ জমির তথ্যও পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। সব মিলিয়ে ১৮৪.৩৩ শতাংশ জমির মালিকানার তথ্য সামনে এসেছে।
ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন বরুয়া-১ মৌজায় জমির ওপর বিলাসবহুল বাড়ি এবং দক্ষিণখান এলাকায় হাসান শওকত ও তার স্ত্রীর নামে ১০তলা ভবন থাকার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নামে জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস এবং হাসান শওকতের বৈধ আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বক্তব্য মেলেনি
হাসান শওকতের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাওয়ায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে যুক্ত করা হবে।