রাজউক ইমারত পরিদর্শক পিয়ালের বিরুদ্ধে ভবন মালিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন ৬/১-এর ইমারত পরিদর্শক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম পিয়ালের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনের আড়ালে বিভিন্ন ভবন মালিকের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। রামপুরা, বনশ্রী, মেরাদিয়া, খিলগাঁও, নয়াপাড়া ও পোড়াবাড়ির মোড়সহ আশপাশের এলাকায় নির্মাণাধীন ও নির্মিত বিভিন্ন ভবনকে কেন্দ্র করে এসব অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ভবন নির্মাণের নকশা, নির্মাণকাজের অনুমোদন, পরিদর্শন এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার কথা বলে ভবন মালিকদের কাছ থেকে টাকা দাবি করা হতো। বিশেষ করে বনশ্রীর এ, ই ও জে ব্লক, মেরাদিয়া এবং খিলগাঁও এলাকার কয়েকটি ভবন নিয়ে পিয়ালের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ রয়েছে। ভবনের কাজ নিয়ম অনুযায়ী চলছে কি না, অনুমোদিত নকশার সঙ্গে নির্মাণকাজ মিলছে কি না—এসব বিষয় পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন ধরনের জটিলতার কথা বলে অর্থ দাবি করার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের ভাষ্য, টাকা না দিলে ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া, পরবর্তী সময়ে অনুমোদন বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে সমস্যা তৈরি করা কিংবা রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ দেওয়ার ভয় দেখানো হতো। অভিযোগ রয়েছে, এসব ক্ষেত্রে পিয়াল কখনো কখনো রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামও ব্যবহার করতেন। ফলে অনেক ভবন মালিক ঝামেলা এড়াতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
একাধিক ভবন মালিকের দাবি, তারা নিয়ম মেনেই নির্মাণকাজ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পরিদর্শনের সময় নতুন নতুন আপত্তি তুলে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভবনের কাজ নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রতিটি ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও অর্থ লেনদেনের প্রমাণ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কিছু ভবনের ক্ষেত্রে রাজউকের প্রয়োজনীয় লিখিত অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। কোথাও অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণ হয়েছে কি না, কিংবা এসব অনিয়মের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কোনো ভূমিকা ছিল কি না—সেটিও তদন্তের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভবন নির্মাণে নিয়ম লঙ্ঘন হলে তা যথাযথভাবে বন্ধ বা ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে যদি অর্থের বিনিময়ে ছাড় দেওয়া হয়, তাহলে এলাকার নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ রামপুরা, বনশ্রী, মেরাদিয়া ও খিলগাঁও এলাকায় অনুমোদনহীন বা নকশাবহির্ভূত ভবন তৈরি হলে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইমারত পরিদর্শক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম পিয়ালের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি। একই বিষয়ে রাজউকের অথরাইজড অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুনের বক্তব্য জানার জন্যও ফোন করা হলে তিনিও সাড়া দেননি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সুশাসন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রাজউকের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হচ্ছে ভবন নির্মাণে আইন ও অনুমোদিত নকশা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা। সেই দায়িত্ব পালনের সময় অর্থ আদায় বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, পুরো সংস্থার কার্যক্রম ও নজরদারি ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।
তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য কি না তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে প্রয়োজনীয় নথি, ভবনের অনুমোদন, পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পরীক্ষা করা দরকার। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে যেসব ভবন অনুমোদন ছাড়া বা নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়েও রাজউকের পক্ষ থেকে পৃথক তদন্ত প্রয়োজন।