আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে উত্তপ্ত তালতলী বিএনপি, শহিদুল হকের অপসারণ দাবি তৃণমূলের
নিজস্ব প্রতিবেদক: বরগুনার তালতলী উপজেলা বিএনপিতে সাবেক আহ্বায়ক শহিদুল হককে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৯ আগস্ট সাবেক উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব মিয়া মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাকের একটি বক্তব্যের পর শহিদুল হক সাংবাদিক সম্মেলন করে পাল্টা বক্তব্য দেওয়ায় দলটির স্থানীয় রাজনীতিতে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই পক্ষের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
১৯ আগস্ট সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সময় মিয়া মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক সাবেক আহ্বায়ক শহিদুল হকের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে ‘পুনর্বাসনের’ চেষ্টা করার অভিযোগ তোলেন এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান বলে দাবি করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শহিদুল হক সাংবাদিক সম্মেলনে পাল্টা বক্তব্য দেন। এতে উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ
শহিদুল হকের বিরুদ্ধে বিএনপির তৃণমূলের একাংশের অন্যতম অভিযোগ, তিনি অতীতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাদের দাবি, ২০১৮ সালে তালতলী উপজেলা যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি মনিরুজ্জামান মিন্টুর আনারস প্রতীকের নির্বাচনী প্রচারণায় একটি সমাবেশে শহিদুল হক বক্তব্য দেন এবং মিন্টুর পক্ষে ভোট চান।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দাবি করছেন, ওই সময় বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছিল এবং দলের অনেক নেতাকর্মী মামলা-মোকদ্দমার কারণে আত্মগোপনে ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির স্থানীয় আহ্বায়ক হিসেবে শহিদুল হকের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছিল।
তাদের আরও দাবি, ওই বক্তব্যের ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও বরগুনা জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নারী ও মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ
শহিদুল হকের বিরুদ্ধে নারীসংক্রান্ত ব্যক্তিগত বিষয় এবং মাদক সেবনের অভিযোগও তুলেছেন তৃণমূলের কিছু নেতাকর্মী। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ বা নথি প্রতিবেদকের কাছে উপস্থাপন করা হয়নি।
এ ছাড়া তার পারিবারিক জীবন নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ ব্যক্তিগত ও স্পর্শকাতর হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া সেগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।
১৯ আগস্টের বক্তব্য ঘিরে সমালোচনা
শহিদুল হকের ১৯ আগস্টের সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে করা বক্তব্য নিয়েও স্থানীয় বিএনপিতে সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব দেওয়ার আগে ‘ড্রপ টেস্ট’ করার বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানান এবং সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেন।
তবে বক্তব্যটির পূর্ণাঙ্গ ভিডিও বা লিখিত বক্তব্য প্রতিবেদকের কাছে না থাকায় উদ্ধৃতির বাইরে এর বিস্তারিত প্রেক্ষাপট নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তৃণমূলের দাবি, সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার
তালতলী উপজেলা বিএনপির তৃণমূলের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে শহিদুল হক স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে রাজনীতি করেছেন এবং এর ফলে উপজেলা বিএনপি সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা তাকে দলীয় পদ ও দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের আরও অভিযোগ, ২০০১ সালে জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে শহিদুল হক বিভিন্ন সময়ে দলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও দীর্ঘ ১৭ বছর বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার কথিত সমঝোতা ছিল।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং অভিযোগকারীদের দাবির সমর্থনে কোনো নথি বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।
পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে বাড়ছে উত্তেজনা
সাবেক সদস্যসচিব মিয়া মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাকের বক্তব্য এবং এর জবাবে শহিদুল হকের সাংবাদিক সম্মেলনের পর তালতলী উপজেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়েছে। দুই পক্ষের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিস্থিতির গুরুত্বকেও সামনে এনেছে।
শহিদুল হকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। একইভাবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বরগুনা জেলা বিএনপির আনুষ্ঠানিক অবস্থানও জানা যায়নি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
বর্তমানে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও অভিযোগকে কেন্দ্র করে তালতলী উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে দলীয় ও প্রশাসনিক পর্যায়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়—সেদিকেই নজর স্থানীয় নেতাকর্মীদের।