কায়কোবাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পাল্টা প্রতিবাদ ঘিরে নতুন প্রশ্ন: তদন্তের বদলে কি চলছে প্রভাবশালী প্রচারণা?
বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চট্টগ্রাম জোন) মো. কায়কোবাদের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রকল্পের কাজে কমিশন নেওয়া, বিল পরিশোধে অনিয়ম, অতিরিক্ত বিলের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়া, বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার, ঠিকাদারদের একটি বিশেষ বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং বৈধ আয়ের সঙ্গে মিল না থাকা সম্পদ অর্জনের অভিযোগ।
এর মধ্যেই মো. কায়কোবাদের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলো অস্বীকার করে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। তিনি অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন, অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করা এবং প্রতিবাদ জানানোর অধিকার তার অবশ্যই রয়েছে। তবে এই প্রতিবাদ প্রকাশের ধরন নিয়েই এখন নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগের জবাব কি সরাসরি তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, নাকি মূল অভিযোগের বিষয় থেকে আলোচনা সরিয়ে অন্য একটি প্রচারণা তৈরি করা হচ্ছে—এটাই এখন আলোচনার বিষয়।
কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সবচেয়ে কার্যকর জবাব হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট নথি সামনে আনা। যেমন কমিশন নেওয়ার অভিযোগ যদি সত্য না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, অনুমোদনের কাগজপত্র এবং অর্থ পরিশোধের নথি যাচাই করলেই বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে। অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ থাকলে প্রকল্পের পরিমাপ বই বা এমবি, কাজের পরিমাণ, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং ঠিকাদারকে দেওয়া বিলের হিসাব মিলিয়ে দেখা সম্ভব। অর্থাৎ অভিযোগের জবাব শুধু বক্তব্য দিয়ে নয়, নথি দিয়েও দেওয়া সম্ভব।
কায়কোবাদের বিরুদ্ধে যে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে, তার মধ্যে প্রকল্পের বিল থেকে কয়েক শতাংশ কমিশন নেওয়ার কথাও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ আর্থিক সুবিধার ব্যবস্থা ছিল। একই সঙ্গে কিছু প্রকল্পে কাজের প্রকৃত পরিমাণের তুলনায় বেশি বিল দেখানো হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই তদন্ত ছাড়া সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথি, কাজের পরিমাপ এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
বদলি ও পদায়ন নিয়েও কায়কোবাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে কে থাকবেন, কোথায় বদলি হবেন কিংবা কোন কর্মকর্তা কোন দায়িত্ব পাবেন—এসব বিষয়ে তিনি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম ছিলেন। এ ধরনের অভিযোগের সঙ্গে যদি বাস্তব কোনো ঘটনা জড়িত থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সময়ের বদলি ও পদায়নের আদেশ, নথি এবং প্রশাসনিক সুপারিশ পরীক্ষা করলেই বিষয়টি যাচাই করা সম্ভব। কারও ব্যক্তিগত বক্তব্য দিয়ে এ অভিযোগের নিষ্পত্তি করা কঠিন।
ঠিকাদারদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্তের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ পাওয়া কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে কায়কোবাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এবং এই যোগাযোগের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ, বিল ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কোনো নির্দিষ্ট ঠিকাদার বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তার সম্পর্ক থাকলেই সেটি অনিয়ম প্রমাণ করে না। তবে যদি একই ঠিকাদার বারবার সুবিধা পেয়ে থাকে, কাজ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম থাকে কিংবা বিল অনুমোদনে অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।
কায়কোবাদের বিরুদ্ধে অতীতে দপ্তরের ভেতরে ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। এই শব্দটি ব্যবহার করে তার বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ বা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং প্রমাণ ছাড়া তা সত্য হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়। তিনি কোন সময়ে কোন দায়িত্বে ছিলেন, তার দায়িত্বের ধরন কী ছিল এবং তার সঙ্গে কোনো আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ আছে কি না—এসব জানতে দাপ্তরিক নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে সম্পদ নিয়েও। অভিযোগ রয়েছে, কায়কোবাদ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা কিছু সম্পদের সঙ্গে তার বৈধ আয় ও ঘোষিত আয়ের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোনো সরকারি কর্মকর্তার সম্পদ বেশি হলেই সেটিকে অবৈধ সম্পদ বলা যায় না। সম্পদটি বৈধভাবে অর্জিত কি না, সেটি বোঝার জন্য আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক লেনদেন, ঋণ, বিনিয়োগ, জমি-বাড়ির দলিল এবং অন্যান্য আর্থিক নথি পরীক্ষা করতে হয়। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—সেটি নির্ধারণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথও দেখা হয়।
এখানেই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কমিশন, প্রকল্পের বিল, ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ, বদলি-পদায়ন এবং সম্পদ নিয়ে একাধিক অভিযোগ থাকলে বিষয়টি শুধু সংবাদমাধ্যমে প্রতিবাদ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা কতটা যুক্তিসংগত—এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। মন্ত্রণালয় চাইলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করতে পারে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের টেন্ডার নথি, কার্যাদেশ, এমবি, বিল-ভাউচার, ঠিকাদারদের তালিকা, বিল অনুমোদনের ধাপ এবং প্রশাসনিক ফাইল পরীক্ষা করা যেতে পারে।
একইভাবে সম্পদের অভিযোগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক লেনদেন ও অন্যান্য বৈধ আয়ের উৎস খতিয়ে দেখা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা সংস্থার সহায়তাও নেওয়া যেতে পারে। এতে অভিযোগ মিথ্যা হলে কায়কোবাদের অবস্থান পরিষ্কার হবে। আবার অভিযোগের কোনো অংশ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, এই ঘটনায় সাংবাদিকতার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কোনো সংবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য না থাকলে তার বক্তব্য নেওয়া সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আবার কেউ নিজের বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগের প্রতিবাদ জানাতেই পারেন। কিন্তু সেই প্রতিবাদের নামে যদি অভিযোগের মূল বিষয় এড়িয়ে গিয়ে শুধু সংবাদমাধ্যম বা প্রতিবেদককে আক্রমণ করা হয়, তাহলে সেটি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কোনো কর্মকর্তা নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট কিছু সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন কি না, তার পেছনে কোনো আর্থিক বা পেশাগত সুবিধার সম্পর্ক আছে কি না—এসব প্রশ্নেরও নিরপেক্ষ উত্তর প্রয়োজন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের জবাব অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা বেআইনি বা অনৈতিক প্রমাণ করে না। একজন ব্যক্তি নিজের বক্তব্য যেকোনো বৈধ মাধ্যমে তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু যদি তদন্তে প্রমাণ পাওয়া যায় যে কোনো সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে উদ্দেশ্যমূলক পাল্টা প্রচারণা চালানো হয়েছে, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা হয়েছে কিংবা কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা ঠিকাদার গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে, তাহলে সেটি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও নৈতিকতার জন্য অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।
এ কারণেই ‘গৃহপালিত সাংবাদিকতা’ বা ‘ম্যানেজড সাংবাদিকতা’র মতো অভিযোগ উঠলে সেটিকেও অন্ধভাবে সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো তদন্ত ছাড়াই উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক হবে না। কারা নিয়মিত একজন কর্মকর্তার পক্ষে সংবাদ প্রকাশ করেন, অভিযোগ প্রকাশের পর কত দ্রুত পাল্টা বক্তব্য আসে, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে ওই কর্মকর্তার কী ধরনের যোগাযোগ রয়েছে এবং কোনো ধরনের আর্থিক, বিজ্ঞাপন বা অন্য সুবিধার সম্পর্ক আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের ভিত্তিতে বের করা দরকার।
মো. কায়কোবাদ তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এখন তার বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। একই সঙ্গে যারা অভিযোগ তুলেছেন, তাদের কাছেও অভিযোগের পক্ষে নথি ও তথ্য থাকার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও অভিযোগকে প্রমাণ ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
সব মিলিয়ে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত। গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ঘিরে যদি কমিশন বাণিজ্য, প্রকল্পের অর্থে অনিয়ম, ঠিকাদার সিন্ডিকেট, বদলি-পদায়নে প্রভাব এবং সম্পদের অসামঞ্জস্যের মতো অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেগুলো দ্রুত যাচাই করা দরকার।
অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমে মো. কায়কোবাদকে দায়মুক্ত করা হোক। আর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে শুধু একজন কর্মকর্তা নয়, তার সঙ্গে জড়িত অন্য কর্মকর্তা, ঠিকাদার বা সুবিধাভোগীদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে যদি কোনো পক্ষ সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার বা পাল্টা প্রচারণা চালিয়ে থাকে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদলিপি দিয়ে কোনো অভিযোগের স্থায়ী নিষ্পত্তি হয় না। সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করবে প্রকল্পের ফাইল, বিল-ভাউচার, পরিমাপ বই, টেন্ডার নথি, বদলি-পদায়নের কাগজপত্র, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন ও সম্পদ বিবরণী। তাই এখন প্রশ্ন একটাই—কায়কোবাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কি সত্যিই ভিত্তিহীন, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো অনিয়মের বাস্তব চিত্র? এর উত্তর সংবাদমাধ্যমের পাল্টাপাল্টি প্রতিবেদনে নয়, একটি নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তেই পাওয়া সম্ভব।