পদ্মা রেল সংযোগে ১৩,৩৬১ কোটি টাকার অডিট আপত্তি: কাজ কম, বিল বেশি—প্রশ্নের মুখে প্রকল্প পরিচালক আফজাল হোসেন ও ঠিকাদাররা
বিশেষ প্রতিবেদকঃ দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প ঘিরে সরকারি বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে এসেছে বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। ২০টি অডিট আপত্তিতে মোট ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। কোথাও প্রকৃত কাজের তুলনায় বেশি বিল, কোথাও চুক্তির বাইরে ব্যয়, কোথাও নিম্নমানের বা কম কাজের বিপরীতে অর্থ পরিশোধ—আবার কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত উপকরণ আমদানির অভিযোগ।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জায়গায় রয়েছেন প্রকল্পটির তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মো. আফজাল হোসেন এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা। কারণ, অডিট প্রতিবেদনের একাধিক পর্যবেক্ষণে প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা, নকশা পরিবর্তনের পর বিল পরিশোধ এবং ঠিকাদারদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো—এসব অভিযোগের পরও আফজাল হোসেন পরবর্তী সময়ে রেলের মহাপরিচালক (ডিজি) পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় অঙ্কের অডিট আপত্তির দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করেই কীভাবে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে বহাল থাকলেন?
ইতোমধ্যে সাংবাদিক আকাশ খান গত ১৩ আগস্ট জনস্বার্থে এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের শনাক্তকরণ এবং রাষ্ট্রের অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের দাবিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করেছেন।
কাজ কমেছে, কিন্তু শতভাগ বিল—২,১৩০ কোটি টাকার প্রশ্ন : সরকারি নিরীক্ষায় সবচেয়ে বড় আপত্তিগুলোর একটি ঢাকা-যশোর রেললাইন নির্মাণকাজ নিয়ে।
অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মূল নকশায় রেললাইনের বাঁধ নির্মাণের গড় উচ্চতা নির্ধারিত ছিল ৭ দশমিক ৩ মিটার। পরবর্তী জরিপে তা কমিয়ে ৫ দশমিক ৬ মিটার নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৭ মিটার কম উচ্চতায় কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়। ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিষয়টি প্রকল্প পরিচালককে অবহিত করে। এরপর সংশোধিত নকশা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। নকশা পরিবর্তনের কারণে মাটি ভরাট, পিভিডি, জিওটেক্সটাইল, সিমেন্ট মিক্সিং পাইল, ব্রিজ ও কালভার্টসহ বিভিন্ন কাজের পরিমাণ কমে যায়। কিন্তু অডিটের অভিযোগ—কাজ কমলেও ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে বিওকিউতে নির্ধারিত শতভাগ বিল। নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষের হিসাবে এর ফলে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে ১৭ কোটি ৫৪ লাখ ৪৪ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ১৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
এখানেই উঠছে সবচেয়ে বিস্ফোরক প্রশ্ন— নকশায় কাজের পরিমাণ কমে গেলে বিলও কমার কথা। তাহলে কাজ কমার পরও শতভাগ বিল পরিশোধের সিদ্ধান্ত হলো কীভাবে ? কার অনুমোদনে হলো? আর সেই সিদ্ধান্তের দায় নেবে কে ?
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশোধিত নকশার ভিত্তিতে চূড়ান্ত মূল্যায়নের পর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য ঠিকাদারকে চিঠিও দেয়।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করেছে, ঠিকাদারকে চুক্তি অনুযায়ী ডলারে বিল দেওয়া হয়েছে এবং অতিরিক্ত কোনো ডলার পরিশোধ করা হয়নি। বর্তমান ডলার বিনিময় হার ব্যবহার করেই অডিট অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়েছে বলেও তাদের বক্তব্য। কিন্তু এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ। অডিট কর্মকর্তাদের মতে, বিওকিউতে দর নির্ধারণ করা হয়েছিল বাংলাদেশি টাকায় এবং পরবর্তী সময়ে মূল্য সমন্বয়ও হয়েছে। ফলে বর্তমান ডলার বিনিময় হার ব্যবহার করে অতিরিক্ত পরিশোধের হিসাব করাকে তারা যৌক্তিক মনে করেছে। আরও গুরুতর বিষয় হলো, চুক্তির GCC 2.5 ধারায় অতিরিক্ত পরিশোধিত অর্থ পরবর্তী বিল থেকে সমন্বয়ের সুযোগ থাকলেও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ তা করেনি বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ অডিটের ভাষ্য সত্য হলে, প্রশ্ন শুধু অতিরিক্ত বিল দেওয়ার নয়—অতিরিক্ত অর্থ সমন্বয় বা আদায়ের সুযোগ থাকার পরও তা না করার পেছনে কার ভূমিকা ছিল, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা উচিত।
৩,৬০৬ কোটি টাকার উচ্চমূল্যের চুক্তি—‘বিশেষায়িত কাজ’ দেখানোর রহস্য : অডিটে আরও বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে প্রকল্পের চুক্তিমূল্য নির্ধারণ নিয়ে। প্রকল্পকে ‘বিশেষায়িত কাজ’ দেখিয়ে প্রাক্কলনের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি দামে চুক্তি করায় ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো—কোন যুক্তিতে কাজটিকে বিশেষায়িত হিসেবে দেখানো হয়েছিল? প্রাক্কলনের তুলনায় এত বেশি দামে চুক্তির প্রয়োজন কেন হলো? এবং এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের ভূমিকা কী ছিল ? এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
বিওকিউ বাড়িয়ে ৭২৮ কোটি—চুক্তির শর্তের বাইরে সুবিধা ? নিরীক্ষায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, টার্নকি বা ইপিসি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে বিওকিউ বাড়িয়ে ৭২৮ কোটি ৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে। দেশীয় মালামালের মূল্য বাংলাদেশি টাকার পরিবর্তে ডলারে পরিশোধের মাধ্যমে ৫১৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা এবং মূল স্পেসিফিকেশনের তুলনায় গড়ে ২০০ মিলিমিটার কম গ্রানুলার স্যান্ড ব্যবহার করেও ২১৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ একদিকে কাজের পরিমাণ বা মান কমার অভিযোগ, অন্যদিকে বিলের অঙ্কে কাটছাঁট না হওয়ার অভিযোগ—দুটি বিষয় পাশাপাশি রেখে দেখলে প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হয়।
অগ্রগতি প্রতিবেদনের চেয়েও বেশি কাজ দেখিয়ে বিল!
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি প্রতিবেদনের তুলনায় বেশি কাজ দেখিয়ে ১ হাজার ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধের অভিযোগও করা হয়েছে।
যদি অডিটের এই পর্যবেক্ষণ সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে প্রকল্পের কাজের বাস্তব অগ্রগতি, পরিমাপ বই, বিল প্রস্তুত, অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়ের প্রতিটি ধাপের নথি যাচাই করা জরুরি। কারণ প্রশ্নটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় অর্থের— যে কাজ হয়নি, সেই কাজের বিল কীভাবে তৈরি হলো? কে পরিমাপ করল ? কে প্রত্যয়ন করল? কে অনুমোদন দিল ?
অতিরিক্ত রেল আমদানিতেও প্রশ্ন : প্রকল্পে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ২ হাজার ৮৫৫ টন UIC-60 রেল আমদানির অভিযোগ তুলেছে অডিট কর্তৃপক্ষ। এর ফলে অতিরিক্ত শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর বাবদ ১২ কোটি ৫১ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, কাজের পরিধি বাড়ায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-গেন্ডারিয়া তৃতীয় লাইন, ভাঙ্গা জংশন, রূপদিয়া, সিঙ্গিয়া ও পদ্মবিলা জংশনসহ বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত রেলের প্রয়োজন হয়েছিল। তবে এই ব্যাখ্যাও অডিট কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেনি। ফলে প্রশ্ন থেকে যায়—প্রকল্পের প্রকৃত প্রয়োজন নির্ধারণে ভুল হয়েছিল, নাকি অতিরিক্ত আমদানির পেছনে অন্য কোনো আর্থিক স্বার্থ কাজ করেছিল ?
আরও যেসব অনিয়মের অভিযোগ : সরকারি বিশেষ নিরীক্ষায় উত্থাপিত ২০টি আপত্তির মধ্যে আরও রয়েছে— একই জমির মূল্য দ্বিতীয়বার নির্ধারণ করে অতিরিক্ত অনুদান দেওয়ায় ১৭১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, ভাঙ্গা রেলস্টেশনের নকশা পরিবর্তনে ২৮৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া গাড়ি কেনায় ১১০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, ব্যালাস্টের পুরুত্ব কম দিয়েও ২৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা;
উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া জমির সীমানা পিলার স্থাপনে ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা,
চুক্তির বাইরে ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার কেনায় ২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, সরকারি জমির মূল্য ব্যক্তির নামে পরিশোধ দেখিয়ে ১১ কোটি ৫ লাখ টাকা, অতিরিক্ত অর্থ ডিএসসিসিকে দিয়ে এফডিআরে রাখায় ৪১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ভাঙ্গা জংশনে অতিরিক্ত মাটি ভরাট দেখিয়ে ৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা, প্রভিশনাল সামের ওপর ওভারহেড চার্জ দিয়ে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, অতিরিক্ত স্থাপনা নির্মাণে পরামর্শককে অনিয়মিত অর্থ পরিশোধ। সব মিলিয়ে সরকারি নিরীক্ষায় ওঠা আপত্তির অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
আফজাল হোসেনের বক্তব্য কী ? অডিট আপত্তির বিষয়ে রেলের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের বক্তব্য জানতে শনিবার দুপুরে তার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে প্রশ্ন আকারে খুদে বার্তা পাঠালে তিনি জানান, অডিটের অধিকাংশ আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং অনেক আপত্তি প্রত্যাহারও করা হয়েছে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য তিনি প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
বর্তমান প্রকল্প পরিচালক নাজনীন আরা কেয়াও বলেছেন, ১৩ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তির বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ একে একে জবাব দিচ্ছে। তার ভাষ্য, অডিট আপত্তি উঠলেই সেটিকে অনিয়ম বলা যায় না; বিষয়গুলোর নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে। এই বক্তব্য অবশ্য তদন্তের প্রয়োজনীয়তাই আরও বাড়িয়ে দেয়। কারণ অডিট আপত্তির কতটি সত্যিই নিষ্পত্তি হয়েছে, কতটি প্রত্যাহার হয়েছে এবং কোন যুক্তিতে হয়েছে—সেসব তথ্য জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
৬৫৮ কোটি টাকার লোকোমোটিভ-কোচ কেনাকাটাতেও অভিযোগ
আফজাল হোসেনকে ঘিরে : শুধু পদ্মা রেল প্রকল্পের অডিট আপত্তিই নয়, নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ কেনায় ৬৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগের পর রেল মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। গত ২ জুলাই সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো চিঠিতে ৬ জুলাই প্রমাণপত্রসহ শুনানিতে উপস্থিত হতে বলা হয়। তবে তদন্ত শেষ হলেও এখন পর্যন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি বলে জানা গেছে। ফলে একই ব্যক্তিকে ঘিরে একাধিক অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের ফলাফল প্রকাশ এবং দায় নির্ধারণের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানেও আফজাল : এরই মধ্যে দুদকের চলমান অনুসন্ধানে রেলের ডিজি মো. আফজাল হোসেনকে ঘিরে আরও গুরুতর অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাথর সরবরাহ ও মোটর মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, অর্থের একটি অংশ অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে তার সন্তানদের নামে রাখা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগের আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সহযোগিতাও চেয়েছে দুদক। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন; আদালত বা কোনো চূড়ান্ত তদন্তে এগুলো প্রমাণিত হয়েছে এমন দাবি করা হচ্ছে না। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য।
টিআইবির প্রশ্ন, তদন্তের স্বার্থে ব্যবস্থা কেন নয় ?
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের মতো বড় প্রকল্পে ওঠা অভিযোগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্তে যাচাই করা উচিত। তদন্তে মন্ত্রণালয়, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, রেলওয়ের কর্মকর্তা কিংবা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। তার মতে, এত বড় অভিযোগের পর তদন্তের স্বার্থে রেলের ডিজিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করতে পারত। কিন্তু তা না করে তাকে পদোন্নতি দেওয়ায় জবাবদিহির ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা গেছে।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য—‘প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা’
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেছেন, রেলের মহাপরিচালকসহ কোনো কর্মকর্তা বা অন্য কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা অনিয়মের বিষয় সরকার নজরে রেখেছে। প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। এখন মূল প্রশ্ন—১৩ হাজার ৩৬১ কোটি টাকার দায় কার ? পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে সরকারি নিরীক্ষায় ওঠা ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অডিট আপত্তি নিছক কোনো হিসাবের গরমিল, নাকি এর আড়ালে প্রকৃত আর্থিক অনিয়ম রয়েছে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
যদি অডিটের অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই— কাজ কম হওয়ার পরও কেন বিল বেশি দেওয়া হলো?
নকশা পরিবর্তনের পরও কেন শতভাগ অর্থ পরিশোধ করা হলো ? চুক্তির বাইরে ব্যয়ের অনুমোদন কারা দিলেন ?
অতিরিক্ত উপকরণ আমদানির প্রয়োজনীয়তা কে নির্ধারণ করেছিলেন ? প্রকৃত অগ্রগতির চেয়ে বেশি কাজ দেখিয়ে বিল অনুমোদনের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন ? আর রাষ্ট্রের অর্থের এই বিপুল আর্থিক সুবিধার প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা ?
প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে যদি অডিটে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর একটি অংশও সত্য প্রমাণিত হয়, তবে বিষয়টি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়—এটি হবে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প তদারকি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির বড় ধরনের ব্যর্থতার উদাহরণ।
এখন প্রয়োজন অডিট আপত্তিগুলো ‘নিষ্পত্তি হয়েছে’—এমন সাধারণ বক্তব্যে থেমে না থেকে প্রতিটি আপত্তির বিপরীতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কত টাকা আদায় হয়েছে, কোন কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের দায় নির্ধারিত হয়েছে এবং কত টাকা এখনো অনাদায়ী—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা। কারণ হাজার হাজার কোটি টাকার প্রশ্নে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় অর্থ জনগণের অর্থ। সেই অর্থের এক টাকাও যদি অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তার দায় নির্ধারণ এবং অর্থ পুনরুদ্ধার করাই এখন সময়ের দাবি।
পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের এই অডিট ঝড় শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে—তা নির্ধারণ করবে একটি বিষয়ই:
১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অডিট আপত্তি কি কেবল কাগজের হিসাব হয়ে থাকবে, নাকি সত্যিই বেরিয়ে আসবে—কাজ কম হওয়ার পরও কার নির্দেশে, কীভাবে এবং কেন রাষ্ট্রের অর্থের এত বড় অঙ্কের বিল পরিশোধ করা হয়েছিল।