বেনাপোল কাস্টমসে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ: সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট আল আমিন সোহাগকে ঘিরে উঠছে নানা প্রশ্ন
বিশেষ প্রতিবেদক: দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। আর এসব পণ্যের সঠিক মূল্য নির্ধারণ ও প্রযোজ্য শুল্ক আদায়ের দায়িত্ব বেনাপোল কাস্টমস হাউসের। তবে এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম, দুর্নীতি, শুল্ক ফাঁকি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগ রয়েছে। এবার একটি ইমিটেশন জুয়েলারির চালানে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ সামনে আসার পর সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট আল আমিন সোহাগের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তা, আমদানিকারক ও সি অ্যান্ড এফ এজেন্টের মধ্যে যোগসাজশ থাকলে প্রকৃত পণ্যের মূল্য ও পরিমাণ গোপন করে কম শুল্কে পণ্য ছাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এতে একদিকে সরকার বিপুল রাজস্ব হারায়, অন্যদিকে একটি চক্র আর্থিকভাবে লাভবান হয়। ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, বেনাপোল কাস্টমসে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
সম্প্রতি ভারত থেকে আসা ইমিটেশন জুয়েলারির একটি চালানে এমন অভিযোগের প্রমাণ মেলার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কাস্টমস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার চকবাজারের ‘টি এল ট্রেডিং’-এর মালিক মোস্তাফিজুর রহমান ভারত থেকে ৬৮৭ প্যাকেজ ইমিটেশন জুয়েলারি আমদানি করেন। প্রায় ১৬ হাজার ৮৫৪ কেজি ওজনের ওই চালানটি বেনাপোল বন্দরের ৪২ নম্বর পণ্যাগারে রাখা হয়। চালানটির মেনিফেস্ট নম্বর ছিল ৬০১/২০২৬/০০৩/০০৪৭২৭৯/০৮।
পণ্য খালাসের জন্য আমদানিকারকের পক্ষে কাস্টমসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন সোহাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও ওরিয়েন্টাল ট্রেডিং সেন্টারের মালিক সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট আল আমিন সোহাগ। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চালানটি পরীক্ষা করা হলে ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পণ্যের মিল পাওয়া যায়নি বলে কাস্টমস সূত্র জানায়। অভিযোগ অনুযায়ী, আমদানির প্রকৃত মূল্য কম দেখানোর পাশাপাশি ঘোষিত পরিমাণের চেয়েও প্রায় ২ হাজার ৪০ কেজি বেশি উচ্চ শুল্কমূল্যের পণ্য পাওয়া যায়।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় আমদানিকারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় এবং জরিমানাও করা হয়। বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার মো. রাহাত হোসেন জানান, কাস্টমস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী ন্যায় নির্ণয়ের মাধ্যমে আমদানিকারকের বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়েছে। তবে শুল্ক ফাঁকির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট বা অন্য কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার তওফিকুর রহমানের সহায়তায় মাত্র ৫১ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য ঘোষণা করে প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় আল আমিন সোহাগের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, অতীতেও উচ্চ শুল্কমূল্যের পণ্যের ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্য কম দেখিয়ে তুলনামূলক কম শুল্কে চালান ছাড় করানোর চেষ্টা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে আল আমিন সোহাগের বক্তব্যও এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি।
শুধু একটি চালান নয়, বেনাপোল কাস্টমসকে ঘিরে আরও বেশ কিছু চালানে শুল্ক ফাঁকি ও মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগ রয়েছে। কাস্টমসের সহকারী কমিশনার অতুল গোস্বামী এবং রাজস্ব কর্মকর্তা সনজুর বিরুদ্ধেও ভারতীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান জি এন এক্সপোর্টার্সের পণ্য নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ‘ইনসুলেটিং ভার্নিশ ফর কপার’ নামের পণ্যের ২০টির বেশি চালানে প্রকৃত মূল্য বিবেচনা না করে প্রতি ইউনিট মাত্র ১ দশমিক ২০ ডলার ধরে শুল্কায়ন করা হয়েছে। এসব চালানের মধ্যে বি/ই নম্বর ৮৯৯৬২, ৮৬৯৭৮, ৮৫৩৬৫, ৮৭৭০১, ৮৯৯৮২ ও ৮৫৩৬সহ কয়েকটি চালানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এভাবে পণ্যের মূল্য কম দেখালে সরকার যেমন রাজস্ব হারায়, তেমনি নিয়ম মেনে আমদানি করা ব্যবসায়ীরাও প্রতিযোগিতায় ক্ষতির মুখে পড়েন।
বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে চলতি বছর বেনাপোল কাস্টমসে মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির বেশ কয়েকটি ঘটনা ধরা পড়েছে। গত ৯ মার্চ ২০২৬ বন্দরের পণ্যাগারে রাখা আরাফাত এন্টারপ্রাইজের একটি চালানে প্রায় ১৭ টন পাটবীজ জব্দ করা হয়। অভিযোগ ছিল, মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে পণ্যটি আমদানি করা হয়েছিল। ওই চালানের সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট ছিল কদর অ্যান্ড কোং।
এর কয়েকদিন পর, ১২ মার্চ রাতে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে বেনাপোল বন্দরের ৩৭ নম্বর শেডে অভিযান চালায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। সেখানে বেকিং পাউডার ঘোষণায় আনা একটি চালান থেকে উচ্চমূল্যের শাড়ি, থ্রিপিস, কসমেটিকস ও কেমিক্যাল পাওয়া যায় বলে জানানো হয়। চালানটির মেনিফেস্ট নম্বর ছিল ৬০১/২০২৬/০০১/০০১৬৩৩৩/০৩। এর আমদানিকারক ছিল সাফা ইমপেক্স এবং সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট ছিল মেসার্স হুদা ইন্টারন্যাশনাল।
গত ১৫ জুনও বেনাপোল বন্দরের ২৬ নম্বর পণ্যাগার থেকে টি এস ইন্টারন্যাশনালের একটি চালান আটক করা হয়। অভিযোগ ছিল, মিথ্যা ঘোষণায় আনা ওই চালানে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের শাড়ি ও ফেসওয়াশ ক্রিম ছিল।
অন্যদিকে বন্দরের ৩৪ নম্বর কেমিক্যাল পণ্যাগারে রাখা আরাফাত এন্টারপ্রাইজের আরেকটি চালান নিয়েও গুরুতর অভিযোগ ওঠে। শিল্পকারখানার কাঁচামাল দেখিয়ে আনা ওই চালানে বিপুল পরিমাণ ভায়াগ্রা পাওয়া যাওয়ার পর সেটি জব্দ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। চালানটির বি-এল নম্বর ছিল ১৯০৪২ এবং সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট হিসেবে দায়িত্বে ছিল হায়দার অ্যান্ড সন্স।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কাস্টমস কর্মকর্তাদের নজরদারি ও যাচাই ছাড়া মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে এমন পণ্য বন্দরে প্রবেশ এবং পরবর্তী সময়ে খালাসের প্রক্রিয়ায় আসা সহজ নয়। তাদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে অসাধু আমদানিকারক ও সি অ্যান্ড এফ এজেন্টদের সঙ্গে কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তা যোগসাজশ করে থাকলে শুল্ক ফাঁকির সুযোগ তৈরি হয়।
বেনাপোল কাস্টমসকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি অভিযানে ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ঘুষসহ রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমা আক্তার এবং তার সহযোগী হিসেবে পরিচিত এনজিও কর্মী হাসিবুর রহমানকে আটক করা হয়। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
এরপর ২২ জুন ২০২৬ রাতে আরও একটি ঘটনা সামনে আসে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার কথা বলে জব্দ করা ভারতীয় উচ্চ শুল্কমূল্যের পণ্য কাস্টমস গুদাম থেকে বের করে নেওয়ার সময় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জিকে বিজিবি আটক করে। পরে তাকেও কারাগারে পাঠানো হয়।
বেনাপোল কাস্টমসের নিরাপত্তা ও পণ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও অতীতে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর রাতে কাস্টমস হাউসের সুরক্ষিত ভল্ট ভেঙে ১৯ কেজি ৩৩৮ গ্রাম সোনা চুরির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় সিআইডির তদন্তে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বিশ্বনাথ কুন্ড, গুদাম ইনচার্জ আরশাদ হোসেন, ভল্ট ইনচার্জ শাহিবুল সর্দ্দারসহ কাস্টমসের সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে বেনাপোল কাস্টমস হাউসে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে। কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেনাপোল কাস্টমসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি কমে যাওয়া, শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণ রাজস্ব ঘাটতির জন্য দায়ী হতে পারে। তবে শুল্ক ফাঁকি, পণ্যের মূল্য কম দেখানো এবং মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগগুলোও যথাযথভাবে তদন্ত করা জরুরি।
ব্যবসায়ী মহলের দাবি, বেনাপোলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরে শুল্ক ফাঁকি বন্ধ করতে প্রতিটি চালানের মূল্য, পণ্যের পরিমাণ ও ঘোষণার তথ্য কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো আমদানিকারক বা সি অ্যান্ড এফ এজেন্টের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু আমদানিকারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাহলেই সরকারের রাজস্ব সুরক্ষার পাশাপাশি বন্দরের প্রতি ব্যবসায়ীদের আস্থাও ফিরবে।