সালমান শাহ হত্যা মামলা, রিমান্ডে ‘তথ্য গোপন’ করায় কারাগারে ডন
বিনোদন ডেস্ক : চলচ্চিত্রনায়ক সালমান শাহকে হত্যা মামলায় অভিনেতা আশরাফুল হক ডন রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন বলে দাবি করেছে তদন্ত সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মামলা সংক্রান্ত সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছে সিআইডি।
পাঁচদিনের রিমান্ড শেষে বুধবার ডনকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান।
এদিকে, তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা।
বিষয়টি জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম।
প্রসঙ্গত, গত ৯ আগস্ট হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেফতার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। এরপর তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। গত ২০ আগস্ট ডনের ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান। রিমান্ড শুনানির দিন রাখা হয় ২৭ আগস্ট। ওইদিন শুনানি নিয়ে ডনের ৫ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত।
বুধবার ডনকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান। আবেদনে বলা হয়, আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সালমান শাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন ডন। ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সালমান শাহর সাথে একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। মামলার এজাহারের পলাতক আসামিদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাদের চেনেন বলে প্রকাশ করলেও মামলার অনেক তথ্য গোপন করছেন ডন।
সালমান শাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে আসামি একত্রে চলাফেরা করার কারণে তার সব তথ্য সম্পর্কে অবগত আছেন। সালমান শাহর মৃত্যুর বিষয় ও মামলার ঘটনার বিষয়ে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি অত্যন্ত কৌশলে কথা বলেন। তবে আসামির আচার-আচরণে, চালচলনে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে অনেক তথ্য প্রমাণ-পাওয়া যাচ্ছে। যেহেতু ঘটনাটি অত্যন্ত আলোচিত ও চাঞ্চলকর, সেহেতু মামলার বিষয়ে পাওয়া সব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। আসামি অত্যন্ত চতুর ও দুর্দান্ত প্রকৃতির লোক হওয়ায় মামলার ঘটনার বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন। মামলার তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনে আসামিকে পুনরায় আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সুতরাং, মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন।
এসআই শাহ আলম বলেন,‘ আসামির পক্ষে কোনও আবেদন ছিল না। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।’
গত বছরের ২০ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম মামলাটি দায়ের করেন।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চিত্রনায়ক সালমান শাহ (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) ঢাকার ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে মারা যান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে সে সময় তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে।
ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। কিন্তু পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে— এমন অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অভিযোগটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করার আবেদন জানান তিনি।
তখন অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে সিআইডি জানায়, সালমান শাহ ‘আত্মহত্যা’ করেন।
সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা দায়ের করেন তার বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান আদালত।
দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই প্রতিবেদন দাখিল করেন মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক। তাতেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।
সালমান শাহের বাবার মৃত্যুর পর তার মা নীলা চৌধুরী মামলটি চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে ‘নারাজি’ দেন নীলা চৌধুরী। তিনি ১১ জনের নাম উল্লেখ করে দাবি করেন, এরা তার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
মামলাটি এরপর তদন্ত করে র্যাব। তখন রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি তুললে ২০১৬ সালের ২১ অগাস্ট ঢাকার বিশেষ জজ ৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার আদেশ দেন।
তখন তদন্তের দায়িত্বে আসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় তারা।
সেখানেও বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৫৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে, জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করে হত্যার অভিযোগের কোনও প্রমাণ মেলেনি।
পিবিআই তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলে, মানসিক যন্ত্রণায় ভুগেই অভিমানী সালমান শাহ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। ওই প্রতিবেদনেও সন্তুষ্ট নন সালমানের মা নীলা চৌধুরী। ছেলের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল, তা জানতে তিনি আরও তদন্ত চান।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন। এরপর আবার সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে কয়েকটি বিষয় নিয়ে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন দায়েরের আবেদন করা হয়।
২০২২ সালের ১২ জুন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন গ্রহণ করেন। তবে বিভিন্ন কারণে আর রিভিশন শুনানি হয়নি।
গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় তার মায়ের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে আদালত। এবিষয়ে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে রমনা মডেল থানা পুলিশকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়।
এজাহারনামীয় আসামিসহ অজ্ঞাতনামা পলাতক আসামিরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজশে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ্কে হত্যা করেছে বলে মামলায় অভিযোগ করেন মোহাম্মদ আলমগীর।