ধর্ষণ থেকে কোটি টাকার সম্পদ—গণপূর্তের প্রকৌশলী তামজিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত কোথায়
বিশেষ প্রতিবেদকঃ দুর্নীতি, ঘুষ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগে প্রায় এক বছর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দেওয়া হলেও গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-৫-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অভিযোগের সঙ্গে ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মতো গুরুতর অভিযোগও যুক্ত করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন বাকী বিল্লাহ নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ ছাড় এবং অবৈধভাবে সম্পদ গড়ার অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগকারী এসব বিষয় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
অভিযোগে বলা হয়, ২০১৩ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনকালে তামজিদ হোসেন প্রভাব খাটিয়ে সরকারি কাজের ক্ষেত্রে সুবিধা নিয়েছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল প্রস্তুত করে সরকারি অর্থ ছাড়ের অভিযোগ করা হয়। কাজের বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে বিলের পরিমাণের মিল ছিল না বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া দরপত্র প্রক্রিয়ায় পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়। অভিযোগকারীর দাবি, নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে দরপত্রের বিভিন্ন ধাপে প্রভাব খাটানো হতো এবং এর বিনিময়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন বা ‘পার্সেন্টেজ’ নেওয়া হতো। সরকারি প্রকল্পের বিল, ভাউচার, কার্যাদেশ ও দরপত্রের নথি যাচাই করলেই এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়, দুদক ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের নাম ব্যবহার করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছিল। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময় এ বিষয়ে অভিযোগ ও আলোচনা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি ছিল এক গৃহকর্মীকে ধর্ষণের অভিযোগ। লিখিত অভিযোগে সুফিয়া নামে এক গৃহকর্মীর কথা উল্লেখ করে দাবি করা হয়, তাকে ধর্ষণের পর বিষয়টি ধামাচাপা দিতে এবং আইনি জটিলতা এড়াতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছিল। তৎকালীন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাজিয়া সুলতানাকে ঘিরেও অভিযোগে তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে অনৈতিক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ করা হয়। এ ছাড়া ভুট্টো নামে তার এক কর্মচারী-কাম-ঠিকাদার বিভিন্ন সময়ে তাকে নারীদের সঙ্গে হোটেলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছিল।
তামজিদ হোসেনের সম্পদ নিয়েও অভিযোগে বেশ কিছু তথ্য উল্লেখ করা হয়। অভিযোগকারীর দাবি, চাকরির সুযোগ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। ঢাকার ধানমন্ডি ২৭/১ এলাকায় রবীন্দ্র সরোবরের ৮ নম্বর ব্রিজের ঢালে একটি বহুতল ভবনে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বর্গফুটের একটি স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের মালিকানার কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। ওই সম্পত্তির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছিল।
এ ছাড়া মোহাম্মদপুরের ২৭/১ পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটির টেক রোড-৭ এলাকায় তামজিদ হোসেনের শ্বশুর মো. জাহিদ মিয়ার সঙ্গে যৌথ মালিকানায় সাততলা একটি ভবন নির্মাণের অভিযোগও করা হয়। অভিযোগে ভবনটির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় তামজিদ হোসেনের নামে বা বেনামে প্রায় ৩০ একর জমি রয়েছে।
অভিযোগে তামজিদ হোসেনের সম্পদের উৎস খুঁজে দেখতে তার আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির দলিল, প্রকল্পের বিল-ভাউচার, দরপত্রের কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন যাচাই করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালনকালে যেসব প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেগুলোর কাজের বাস্তব অগ্রগতি এবং ছাড় করা অর্থের হিসাব মিলিয়ে দেখার কথাও বলা হয়।
তবে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর অভিযোগ দায়েরের পর এখন পর্যন্ত দুদকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কী ধরনের অনুসন্ধান হয়েছে, কোনো কর্মকর্তা তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন কি না কিংবা অভিযোগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে প্রকাশ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, দীর্ঘ সময় দুদকে কমিশন না থাকায় অনেক অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রমে ধীরগতি তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে নতুন কমিশন গঠিত হওয়ার পর আগের অভিযোগগুলোও পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পুনরায় তদন্ত বা অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সৈয়দ তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, এসব অভিযোগের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কারা এবং কী উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন, সে বিষয়েও তিনি অবগত নন বলে জানান।
ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও আর্থিক তথ্য যাচাই। প্রকল্পের বিল-ভাউচার, দরপত্রের কাগজপত্র, ঠিকাদারদের সঙ্গে লেনদেন, আয়কর বিবরণী এবং সম্পদের মালিকানা যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর বাস্তব ভিত্তি কতটা রয়েছে, তা স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে ধর্ষণ ও চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা আদালতের কোনো নথি রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগ দায়েরের প্রায় এক বছর পরও তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। এখন দুদকের চলমান কার্যক্রমে এই পুরোনো অভিযোগটি নতুন করে পর্যালোচনা করা হয় কি না এবং অভিযোগগুলোর পক্ষে-বিপক্ষে থাকা তথ্য যাচাই করে কোনো সিদ্ধান্ত আসে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।