কমিশন বাণিজ্য ও বিপুল সম্পদের অভিযোগে আলোচনায় গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কায়কোবাদ
বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই-এম) মো. কায়কোবাদকে ঘিরে কমিশন বাণিজ্য, প্রভাব খাটানো এবং বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারের দাবি, বিভিন্ন সময়ে অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে তিনি ঠিকাদারদের কাছ থেকে কাজের বিনিময়ে কমিশন আদায়ের একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলম, তার পর দায়িত্ব পালন করা মোহাম্মদ শামীম আখতার এবং বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানের সময়েও কায়কোবাদ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। দপ্তরের ভেতরে তিনি ‘ক্যাশিয়ার’ নামে পরিচিত বলেও দাবি করেছেন কয়েকজন। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ৪ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়। একটি সার্কেলের বার্ষিক কাজের হিসাব ধরলেও এই হার অনুযায়ী বড় অঙ্কের অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয় বলে তাদের দাবি। তবে নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পে কমিশন নেওয়ার অভিযোগের পক্ষে যাচাইযোগ্য নথি বা চূড়ান্ত তদন্তের ফলাফল এখানে পাওয়া যায়নি।
কায়কোবাদের অধীন বিভিন্ন সার্কেলে প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন না করেই পুরো বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবে কাজ না করেও শতভাগ বিল উত্তোলন করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগের সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী পবিত্র কুমার দাসের নামও এসেছে। মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এরপরও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে অধীন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কাজ না করে বিল তোলার অভিযোগ থাকলে তদারকির দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কায়কোবাদ সংশ্লিষ্ট সার্কেলগুলোর দায়িত্বে থাকাকালে প্রকল্পের কাজ, বিল অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে তদারকি করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রকল্পের কার্যাদেশ, কাজের পরিমাপ, বিলের নথি, পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং অর্থ পরিশোধের রেকর্ড পরীক্ষা করা জরুরি।
কায়কোবাদের বিরুদ্ধে ওঠা আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো, সরকারি চাকরি থেকে পাওয়া আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর ইকবাল রোডের ‘এ’ ব্লকে ‘আমেনাস ড্রিম’ ভবনে আনুমানিক সাত কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া উত্তরায় দুটি, ধানমন্ডিতে একটি এবং বনানীতে দুটি ফ্ল্যাট থাকার তথ্য দিয়েছেন সূত্রগুলো।
সম্পদের তালিকায় পূর্বাচলের আমুলিয়া প্রজেক্টে ৪০ কাঠা জমি থাকার অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকার ধামরাইয়ে একটি ১০ তলা ভবন এবং কায়কোবাদের নিজ জেলা শেরপুরে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি থাকার দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের আরও অভিযোগ, আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের নাম ব্যবহার করেও সম্পদ রাখা হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব সম্পত্তির দলিল, খতিয়ান, নিবন্ধন নথি কিংবা প্রকৃত মালিকানা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরিবারের ব্যবহারের জন্য নতুন মডেলের একটি টয়োটা এক্সিও গাড়ি থাকার কথাও উল্লেখ করেছেন সূত্রগুলো। তাদের দাবি, গাড়িটি আলআমিন নামের এক চালকের নামে রয়েছে। তবে গাড়িটির নিবন্ধিত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং কায়কোবাদ বা তার পরিবারের সঙ্গে এর আর্থিক সম্পর্ক সম্পর্কে কোনো যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। এ কারণে গাড়িটিকে তার সম্পদ হিসেবে নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করার আগে সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করা জরুরি।
কায়কোবাদের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায় নিয়েও আলোচনা রয়েছে। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের সময় তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই-এম) হিসেবে গণপূর্তের ই-এম প্ল্যানিং সার্কেলে কর্মরত ছিলেন। পরে চট্টগ্রাম ই-এম সার্কেলে দায়িত্ব পালন করে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ই-এম সার্কেল-২-এর দায়িত্ব পান। কয়েকজন সহকর্মীর অভিযোগ, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয় ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন সময়ে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। তবে এই অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট লেনদেনের নথি বা কোনো তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনে নেই।
সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান চলার কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত কায়কোবাদের সম্পদ ও আয়ের উৎসও একইভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে কি না। তবে কায়কোবাদকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের কারণে তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, কায়কোবাদের নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের বৈধ উৎস, প্রকল্পের বিল অনুমোদন, ঠিকাদারদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন এবং তার অধীন সার্কেলগুলোর কাজের বাস্তব অগ্রগতি খতিয়ে দেখা হোক। অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে অভিযোগে নাম আসা কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়া এবং অভিযোগগুলোর নথিভিত্তিক যাচাই নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রতিবেদন তৈরির সময় গত ৪ ও ৫ অক্টোবর মো. কায়কোবাদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হয়। হোয়াটসঅ্যাপেও বার্তা পাঠিয়ে তার বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা পর্যন্ত তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে যুক্ত করা হবে।