ভুয়া টিপিতে কাঠ পাচারের অভিযোগ, বান্দরবান-চট্টগ্রামের বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অনুসন্ধান দাবি
বিশেষ প্রতিবেদকঃ বান্দরবান ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা কাঠ পরিবহনের অনুমতি দেওয়া এবং ঘুষের বিনিময়ে কাঠভর্তি ট্রাক ঢাকায় পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কাঠের প্রকৃত উৎস, পরিমাণ ও বৈধতা যথাযথভাবে যাচাই না করেই ট্রানজিট পাস (টিপি) দেওয়া হয়েছে। পরে চেকপোস্টে ট্রাক আটকের নির্দেশ এলেও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে সেগুলো ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ৭ ও ১২ অক্টোবরের কয়েকটি ঘটনায় মোট কয়েক লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ সামনে এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বান্দরবান বন বিভাগের সদর রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী সাইফুলের নেতৃত্বে দুটি ট্রাকে কাঠ বোঝাই করা হয়। ট্রাক দুটির নম্বর পিরোজপুর-ট ১১-০১৮৬ এবং চট্ট মেট্রো-ট ১২-০৬৭৯। মহিউদ্দিন ও কায়সার নামের দুই ব্যবসায়ীর সংশ্লিষ্টতায় কাঠ পরিবহনের এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ট্রাকে বোঝাই করা কাঠের জাত, পরিমাণ ও বৈধ উৎস যথাযথভাবে পরীক্ষা না করেই লোডিং চেক সম্পন্ন করা হয় এবং পরিবহনের জন্য ট্রানজিট পাস দেওয়া হয়। অথচ কাঠ পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অনুমোদন যাচাই করা বন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কাঠের উৎস বা বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তা পরীক্ষা না করে পরিবহনের অনুমতি দেওয়ার মাধ্যমে অবৈধ কাঠ পাচারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিষয়টি গোপন সূত্রে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো এবং চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবু নাসের মোহাম্মদ মহাসিনকে জানানো হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে কাঠভর্তি ট্রাক দুটি আটকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল বলেও জানা গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রাক দুটি আটকের নির্দেশ দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো আটকে রাখা হয়নি। ফৌজদারহাট ও ধূমঘাট চেক স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা আশরাফুল আলম ও শামীম রেজার বিরুদ্ধে ট্রাকমালিকদের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনজনের একটি চক্র দুই লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে রাতের দিকে ট্রাক দুটি ছাড়ার ব্যবস্থা করে। পরে ভোর আনুমানিক তিনটার দিকে ট্রাক দুটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়।
এর কয়েক দিন পর, ১২ অক্টোবর, একই ধরনের আরেকটি ঘটনার অভিযোগ সামনে আসে। সোহেল কেরানির মালিকানাধীন চট্ট মেট্রো-ট ১১-০৫৩৮ নম্বরের একটি ট্রাকে কাঠ বোঝাই করে ঢাকার পথে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। ট্রাকটির সঙ্গে টিপি নম্বর ০৩/০০৩৫৩৭ যুক্ত ছিল, যার তারিখ ১১ অক্টোবর ২০২৬।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই ট্রাকটির বিষয়েও গোপন সূত্রে বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো এবং ডিএফও আবু নাসের মোহাম্মদ মহাসিনকে জানানো হয়। পরে ডিএফও ফৌজদারহাট চেক স্টেশনের কর্মকর্তা আশরাফুল আলমকে ট্রাকটি আটকানোর নির্দেশ দেন।
কিন্তু অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ট্রাকটি আটকানোর পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করে বিষয়টি নিজেদের মধ্যে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। এতে ধূমঘাট চেক স্টেশনের কর্মকর্তা শামীম রেজা এবং সদর রেঞ্জের কর্মকর্তা কাজী সাইফুলের যোগসাজশ ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ট্রাকটির কাঠের বৈধতা যাচাইয়ের নামে রাতে একটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এরপর দুই লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে ট্রাকটি ছেড়ে দেওয়ার সমঝোতা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে আরও এক লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে তিন লাখ টাকার বিনিময়ে ট্রাকটি ঢাকার উদ্দেশে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
এখানেই শেষ নয়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সংবাদ প্রকাশ ঠেকানো বা গণমাধ্যমের কাছে বিষয়টি পৌঁছানো বন্ধ করার কথা বলে কাজী সাইফুলের কাছ থেকে আরও এক লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এই অভিযোগগুলোর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। কাঠ পরিবহনের জন্য দেওয়া টিপিগুলো যথাযথ নিয়মে ইস্যু করা হয়েছিল কি না, ট্রাকে থাকা কাঠের পরিমাণ ও ধরন নথির সঙ্গে মিলেছিল কি না, কাঠের উৎস বৈধ ছিল কি না এবং চেকপোস্টে ট্রাক আটকের পর কোন প্রক্রিয়ায় সেগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি।
একই সঙ্গে ট্রাক ছাড়ার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করা হয়েছিল কি না এবং কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে সরকারি দায়িত্ব পালনে অনিয়ম, অবৈধ কাঠ পরিবহনে সহায়তা এবং ঘুষ গ্রহণের মতো গুরুতর বিষয় সামনে আসতে পারে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ডিএফও আবু নাসের মোহাম্মদ মহাসিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে জানাবেন বলে জানান। এরপর তিনি আর যোগাযোগ করেননি বলে অভিযোগকারী পক্ষের ভাষ্য। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ফরেস্টার দাবি করেছেন, অভিযোগে উল্লেখ করা ঘুষের টাকার একটি অংশ ডিএফও নিজেও পেয়েছেন। তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তাই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
সদর রেঞ্জের কর্মকর্তা কাজী সাইফুল, ফৌজদারহাট চেক স্টেশনের কর্মকর্তা আশরাফুল আলম, ধূমঘাট চেক স্টেশনের কর্মকর্তা শামীম রেজা, বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো এবং কাঠ ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন, কায়সার ও সোহেল কেরানির বক্তব্যও এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
বনাঞ্চল থেকে কাঠ সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সেই ব্যবস্থার মধ্যেই যদি ভুয়া বা অনিয়মপূর্ণ টিপি ব্যবহার করে কাঠ পরিবহনের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাঠ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার চেকপোস্টে ট্রাক আটকানোর পর নিয়ম মেনে যাচাই না করে ছেড়ে দেওয়া হলে পরিবহন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট টিপি, লোডিং চেকের নথি, কাঠের পরিমাণ ও উৎসের কাগজপত্র, চেকপোস্টের রেজিস্টার, ট্রাক চলাচলের তথ্য এবং ট্রাক ছাড়ার নির্দেশসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থ লেনদেনের বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ রয়েছে কি না, সেটিও অনুসন্ধান করা উচিত।
এখন দেখার বিষয়, বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাগুলো তদন্ত করে কাঠ পরিবহনের অনুমোদন এবং ট্রাক ছাড়ার পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে কি না। অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।