ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাতের অভিযোগ, আই.কে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি

এস এম বদরুল আলম : দেশে আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি ওষুধের গুণগত মান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া এবং বাজারজাতকরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। আই.কে আয়ুর্বেদিক ঔষধালয় লিমিটেড ও আই.কে ল্যাবরেটরীজ (ইউনানি) নামের একই মালিকের  দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান দুটির কয়েকটি পণ্যের উপাদান, কার্যকারিতা ও মূল্য নির্ধারণ নিয়েও আপত্তি তুলেছেন তাঁরা।

অভিযোগকারীদের দাবি, নির্ধারিত ফর্মুলারি ও প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণ করে ওষুধ উৎপাদন করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান দুটির উৎপাদিত পণ্যের নমুনা পরীক্ষা, অনুমোদিত উপাদানের সঙ্গে প্রকৃত উপাদানের সামঞ্জস্য যাচাই এবং বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

উৎপাদন লাইসেন্স ও পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন: প্রাপ্ত অভিযোগে বলা হয়েছে, আই.কে আয়ুর্বেদিক ঔষধালয় লিমিটেডের উৎপাদন লাইসেন্স নম্বর আয়ূ-০৮৬ এবং আই.কে ল্যাবরেটরীজ (ইউনানি)-এর উৎপাদন লাইসেন্স নম্বর ২৯৮। অভিযোগে উভয় প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ঢাকা, বাংলাদেশ উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠান দুটি বাংলাদেশ জাতীয় আয়ুর্বেদিক ফর্মুলারি ও বাংলাদেশ জাতীয় ইউনানি ফর্মুলারিসহ প্রযোজ্য মানদণ্ড অনুসরণ করে পণ্য উৎপাদন করছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। তাঁদের অভিযোগ, কিছু পণ্যে ব্যবহৃত রং, ফ্লেভার ও রাসায়নিক উপাদানের ধরন এবং পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পণ্যের অনুমোদিত ফর্মুলা, উৎপাদনসংক্রান্ত নথি, কাঁচামালের উৎস, মান নিয়ন্ত্রণের প্রতিবেদন এবং পরীক্ষাগার পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অনুমোদিত উপাদানের বাইরে কোনো উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণেও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা জরুরি।

যেসব পণ্যের বিষয়ে অভিযোগ: অভিযোগে আই.কে আয়ুর্বেদিক ঔষধালয় লিমিটেডের কয়েকটি পণ্যের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে কামিনী বিদ্রাবণ রস (হালুয়া), শুক্রসুধা (হালুয়া), বৃহৎ চন্দ্রোদয় মকরধ্বজ ট্যাবলেট, আই.কে আমলকি রসায়ন, আই.কে দশমূলারিষ্ট, আই.কে রোজ ভিট, শরবত তুলসী, আই.কে গোল্ড ট্যাবলেট এবং আই.কে অর্জুনারিষ্ট সিরাপ।

অন্যদিকে আই.কে ল্যাবরেটরীজ (ইউনানি)-এর যেসব পণ্যের নাম অভিযোগে এসেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে আরক ডাইকোপ্লেক্স, ফওলাদ সিয়াল, আরক ডাইকোপ্লেক্স গোল্ড, নাইট্রিন (জিরিয়ানি), কার্ডিফেক্স সিরাপ, আই.কে ভিট সিরাপ, আই.কে জিনসিন বা শরবত জিনসিন এবং বাসক সিরাপ।

অভিযোগকারীরা এসব পণ্যের গুণগত মান, উপাদান, কার্যকারিতা ও মূল্য নির্ধারণের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার দাবি করেন। পণ্যগুলোর প্রকৃত মান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে নিরপেক্ষ পরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

পণ্যের কার্যকারিতা ও মূল্য নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক: অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৃহৎ চন্দ্রোদয় মকরধ্বজ ট্যাবলেটের প্রতি প্যাকেটে ৩০টি ট্যাবলেটের মূল্য ৯০০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। পণ্যটিকে বীর্যস্থাপক ও বলবীর্যবর্ধক হিসেবে উপস্থাপন করা হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া ডামিয়াগরা নামের একটি পণ্য পুরুষের যৌন সমস্যা, লিঙ্গোত্থানে অক্ষমতা, যৌন আকাঙ্ক্ষার ঘাটতি, দ্রুত বীর্যপাত, অবসাদ ও আত্মবিশ্বাসের সমস্যায় কার্যকর বলে প্রচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনে পণ্যটির মূল্য ৭০০ টাকা।

একইভাবে ডিবেডেক্স নামের একটি পণ্যকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ইনসুলিন নিঃসরণে সহায়তা, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমানো এবং অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষের সুরক্ষা ও পুনরুজ্জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রচার করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। পণ্যটির উল্লেখিত মূল্য ৮১০ টাকা।

এসব পণ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রচারিত কার্যকারিতার পক্ষে কী ধরনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট দাবিগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত কি না এবং পণ্যের উপাদান ও মান নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে কি না।

বিশেষ করে ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে কোনো পণ্যের কার্যকারিতা সম্পর্কে যাচাইহীন দাবি রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা ব্যাহত করতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট পণ্যের অনুমোদিত ব্যবহার, লেবেলে উল্লেখিত দাবি এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ:প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, অধিদপ্তরের নথি ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট তদারকির দায়িত্বে থাকা কিছু ব্যক্তির সহযোগিতা ছাড়া অনিয়ম চলতে পারে না।

অভিযোগে একজন পরিচালক, একজন উপপরিচালক, একজন সহকারী পরিচালক, একজন ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক, নথিসংশ্লিষ্ট একজন উচ্চমান সহকারী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।

অনলাইন বিক্রয় ও প্রচার নিয়েও যাচাই প্রয়োজন: অভিযোগে খালিদ বাজার ডটকম নামে একটি অনলাইন পোর্টালের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সেখানে কিছু পণ্য বেশি দামে বিক্রি এবং মানসংক্রান্ত প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও পণ্যের কার্যকারিতা নিয়ে প্রচার চালানো হচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পণ্যের বিবরণ, মূল্য, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, অনুমোদনের তথ্য, বিক্রয় রসিদ এবং ক্রেতাদের অভিযোগ যাচাই করা প্রয়োজন। ওয়েবসাইটটির পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক কী, সেটিও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা দরকার।

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কী করা প্রয়োজন: আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি ওষুধসহ সব ধরনের ওষুধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ন্ত্রণ, সঠিক লেবেলিং, অনুমোদিত উপাদান ব্যবহার এবং বাজারজাতকরণসংক্রান্ত নিয়ম অনুসরণ করা প্রয়োজন। কোনো পণ্যের উপাদান বা কার্যকারিতা নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষ পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাছে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটির উৎপাদনসংক্রান্ত নথি ও লাইসেন্সের শর্ত যাচাই, অভিযোগে উল্লিখিত পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পরীক্ষা, অনুমোদিত ফর্মুলার সঙ্গে প্রকৃত উপাদানের তুলনা এবং অনলাইন প্রচারে ব্যবহৃত চিকিৎসাসংক্রান্ত দাবির বৈধতা যাচাই।

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তদন্তের ফলাফল যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রকাশের দাবিও জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।