রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ওয়াসায় দুর্নীতির অভিযোগ, আবু সাঈদের সম্পদ ও পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন
বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা ওয়াসার উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু সাঈদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে দায়িত্ব পালন, রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়, অবৈধ সম্পদ গঠন এবং অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে এসব তথ্য সামনে এসেছে। অভিযোগে রাজধানীর আফতাব নগরে বহুতল ভবন, একাধিক গাড়ি, কুমিল্লায় জমি ও বাংলো বাড়ি এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রাখার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও যাচাইয়ের ওপর।
আবু সাঈদের রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও অভিযোগে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তার স্ত্রীও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। তার বড় বোন নুরজাহান মজুমদার কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী মহিলা লীগের সভাপতি ছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। ছোট বোন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী মহিলা লীগের সহসভাপতি, বড় ভাই কুমিল্লা উত্তর শ্রমিক লীগের সহসভাপতি এবং বাবা নিজ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বাহাউদ্দিন নাছিম তার মামাশ্বশুর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচিতি ও প্রভাব কাজে লাগিয়েই তিনি দীর্ঘদিন ওয়াসায় নিজের অবস্থান শক্তিশালী রেখেছিলেন।
রাজস্ব বিভাগে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব বিভাগের অধীন বিভিন্ন জোনে কর্মরত রাজস্ব পরিদর্শকদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হতো। অভিযোগে বলা হয়েছে, আবু সাঈদ এ অর্থ সংগ্রহের কাজে যুক্ত ছিলেন এবং ওয়াসার তৎকালীন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম মোস্তফা কামাল মজুমদারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতেন। বিভিন্ন জোন থেকে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ এস এম মোস্তফা কামাল মজুমদারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এভাবে রাজস্ব বিভাগের ভেতরে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে উঠেছিল, যার মাধ্যমে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নেওয়া হতো। তবে কতজন কর্মকর্তার কাছ থেকে কী পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়েছে, অর্থ লেনদেনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে অর্থ ভাগাভাগির বিষয়টি তদন্তে কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত যাচাই প্রয়োজন। এস এম মোস্তফা কামাল মজুমদার ও মোহাম্মদ আবু সাঈদের বক্তব্যও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দীর্ঘদিন তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি আবু সাঈদের রাজনৈতিক ও পারিবারিক যোগাযোগের প্রভাব খাটিয়ে দুদকের অনুসন্ধানও বাধাগ্রস্ত করা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তবে অনুসন্ধানের নথি, তদন্তের অগ্রগতি এবং কোনো তদন্ত কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা যায় না।
আফতাব নগরে সাততলা ভবন, দুটি গাড়ি ও কুমিল্লায় সম্পদের অভিযোগ
আবু সাঈদের সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, ওয়াসায় চাকরি করে অর্জিত বৈধ আয়ের তুলনায় তার ও পরিবারের সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি। অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজধানীর আফতাব নগরের এল-ব্লকের ২ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়িতে তিনি সাততলা ভবন নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া তার ব্যবহারের জন্য ঢাকা মেট্রো-খ ১২-০৩৬৮ এবং ঢাকা মেট্রো-চ ৫৩-৮৫০৩ নম্বরের দুটি গাড়ি থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নিজ জেলা কুমিল্লায় জমি কেনার পাশাপাশি সেখানে বড় আকারের একটি বাংলো বাড়ি নির্মাণ করেছেন তিনি। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকার স্থায়ী আমানত বা এফডিআর রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, এসব সম্পদের বৈধ উৎস, ক্রয়ের সময়কাল এবং আয়কর নথির সঙ্গে সম্পদের হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ ছাড়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, সম্ভাব্য আইনি জটিলতা এড়াতে আবু সাঈদ নিজের নামে সম্পদ না রেখে স্ত্রী ও সন্তানদের নামে জমি, বাড়ি ও আর্থিক সম্পদ রেখেছেন। পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তির দলিল যাচাই করলে সম্পদের প্রকৃত মালিকানা এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে বলে অভিযোগকারীরা মনে করেন। তবে সংশ্লিষ্ট দলিল, ব্যাংক হিসাব, আয়কর বিবরণী ও সম্পদ বিবরণী যাচাই ছাড়া এসব সম্পদ অবৈধভাবে অর্জিত বা অন্যের নামে গোপন করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
দুদকের নথিতে স্মারক নম্বর জালিয়াতি ও পদ বাণিজ্যের অভিযোগ
দুদকের প্রধান কার্যালয়ে প্রক্রিয়াধীন বলে উল্লেখ করা একটি অনুসন্ধানী নথির তথ্যও অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে। নথি নম্বর ০০.০১.০০০০.৫০১.০১.০১৪.২২ এবং ই/আর নম্বর ৬২/২০২২ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন উন্নয়ন ও রাজস্ব কার্যক্রমে স্মারক নম্বর জালিয়াতি এবং পদ বণ্টনকে কেন্দ্র করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ অনুসন্ধানের বিষয় ছিল। অভিযোগে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নূর আলম সিদ্দিকীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে নথিতে অভিযোগের উল্লেখ থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। স্মারক নম্বর জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট ঘটনা, সংশ্লিষ্ট আদেশ বা নথি, অর্থের পরিমাণ এবং আবু সাঈদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনুসন্ধানটি বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে, কোনো প্রতিবেদন জমা পড়েছে কি না কিংবা এ বিষয়ে কোনো মামলা বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা-ও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
বিদেশে অর্থ পাচার ও দেশ ছাড়ার প্রস্তুতির দাবি
আবু সাঈদের বিরুদ্ধে বিদেশে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলা এবং অর্থ পাচারের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, দেশে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। তবে বিদেশে সম্পদ বা অর্থ পাচারের দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট দেশ, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির দলিল, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত তথ্য এখানে উল্লেখ নেই। ফলে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব ও সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও পদায়ন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা ওয়াসার যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী আগের সময়ে বঞ্চনা ও হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন, তাদের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আবু সাঈদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে গত ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ওয়াসার প্রশাসন বিভাগ-১-এ উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। এ পদায়নকে ঘিরে আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, গুরুতর অভিযোগের বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই না করে কীভাবে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পদায়ন করা হলো। তবে পদায়নের সিদ্ধান্তের পেছনে অনিয়ম বা অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আদেশ, প্রশাসনিক নথি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, মোহাম্মদ আবু সাঈদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, সম্পদের উৎস এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দুদকের অনুসন্ধানের অগ্রগতি প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থানও যথাযথভাবে তুলে ধরা উচিত।