ইরানের ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হদিস মিলছে না: আইএইএ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়ামের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারছে না আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর সংস্থাটির পরিদর্শকেরা ইরান ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশটির পারমাণবিক উপাদানের হিসাব যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এ তথ্য জানান আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি।
নিরাপত্তা পরিষদে গ্রোসি বলেন, ইরানের সঙ্গে আইএইএর সুরক্ষা চুক্তির আওতায় থাকা কোনো পারমাণবিক উপাদান অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়নি, তা এখনো যাচাই করতে পারেনি সংস্থাটি। এ অনিশ্চয়তা দূর করা সম্ভব হলেও সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গত মাসে আইএইএর পরিচালনা পর্ষদ ইরানের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব পাস করে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিরাপত্তা পরিষদে পাঠায়। এর পর মঙ্গলবার ১৫ সদস্যের পরিষদে প্রথমবারের মতো ব্রিফিং দেন গ্রোসি। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের অভিযোগে গত ২০ বছরের মধ্যে এই প্রথম ইরানকে নিরাপত্তা পরিষদে তোলা হয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রস্তাবটির পক্ষে ২৩টি দেশ ভোট দেয়। বিপক্ষে ভোট পড়ে তিনটি এবং আটটি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। তবে তেহরান এ সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বেআইনি আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে।
গ্রোসি জানান, ইরানের পারমাণবিক উপাদানের সুরক্ষা ও হিসাবসংক্রান্ত অমীমাংসিত বিষয়গুলো পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সামরিক হামলার পর পরিদর্শকদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে যাচাই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তার ভাষ্য, আইএইএর পরিদর্শকেরা কয়েক মাস ধরেই ইরানে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন।
ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন আইএইএ প্রধান। তিনি জানান, ওমান, পাকিস্তান, কাতার ও মিসর এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির পৃষ্ঠপোষকতায় এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তির সহায়তায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত কায়রো চুক্তির কথা উল্লেখ করেন তিনি।
গ্রোসির মতে, সামরিক হামলার পর ইরানের নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ মোকাবিলা এবং একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় পারমাণবিক যাচাই কার্যক্রম চালু করার ক্ষেত্রে কায়রো চুক্তি একটি বাস্তবসম্মত পথ তৈরি করেছিল। চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা করা হলে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর বর্তমান অবস্থা নির্ধারণেও অগ্রগতি সম্ভব।
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ফোরদো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, নাতাঞ্জের প্রধান ও পরীক্ষামূলক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, ইসফাহান কমপ্লেক্সের কয়েকটি স্থাপনা এবং খোন্দাবের ভারী পানি গবেষণা চুল্লি।
গ্রোসি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি অনুযায়ী কোনো দেশ একতরফাভাবে তার আইনি বাধ্যবাধকতা স্থগিত করতে পারে না। তাই ইরানের পারমাণবিক উপাদানের হিসাব ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের কাজ পুনরায় চালু করা প্রয়োজন।
তবে বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কিছু অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন তিনি। সেখানে বর্তমানে আইএইএর পরিদর্শকেরা কাজ করছেন। ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি নতুন একটি শুষ্ক সংরক্ষণাগারে স্থানান্তরের আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়েও ইরানের আণবিক শক্তি কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা করছে। আগামী বছরের শুরুর দিকে জ্বালানি স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসফাহান জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে আইএইএর। ২০২৫ সালের জুনে সামরিক হামলার ঠিক আগে ইরান কেন্দ্রটির বিষয়ে সংস্থাটিকে জানিয়েছিল এবং পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু হামলার কারণে পরিদর্শন সম্ভব হয়নি। এরপর ওই স্থাপনায় প্রবেশের জন্য আইএইএর একাধিক অনুরোধ তেহরান প্রত্যাখ্যান করেছে।
গ্রোসি আরও জানান, দূরবর্তী নজরদারি ব্যবস্থায় এমন কোনো তৎপরতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা থেকে ধারণা করা যায় যে ২০২৫ সালের হামলার পর কিংবা চলতি বছরে ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো মেরামত বা পুনর্নির্মাণের চেষ্টা চলছে। তবে স্থাপনাগুলোর প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিত করতে সরাসরি পরিদর্শনের বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আইএইএ প্রধান বলেন, ইরানে পরিদর্শকদের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে মার্কিন সমঝোতাকারী ও কারিগরি দলগুলোর সঙ্গে সংস্থাটির বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি কূটনৈতিক সমঝোতার জন্য প্রাথমিক কারিগরি প্রস্তুতিও রয়েছে।
গ্রোসি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যেকোনো সমাধানের ক্ষেত্রে আইএইএর যাচাই কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। যাচাই ছাড়া কোনো সমঝোতার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় এবং তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হওয়ার সম্ভাবনাও কম।
তিনি তেহরানকে ধাপে ধাপে কারিগরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে স্বাভাবিক পারমাণবিক সুরক্ষা ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বৃহত্তর সমঝোতার জন্য পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা যায়। একই সঙ্গে ইরানের বৈধ নিরাপত্তা ও সুরক্ষাসংক্রান্ত উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
গ্রোসির ভাষ্য, আইএইএর যাচাইয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত কূটনীতিই ইরানসহ বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে।