গণপূর্তের মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে সরকারি টাকা আত্মসাৎ, শ্রমিকের মজুরি কম দেওয়া ও পার্কের অর্থ লোপাটের অভিযোগ
বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও পার্কের সবুজায়ন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের আরবরিকালচার উপবিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া ভাউচার তৈরি, দিনমজুরদের প্রাপ্য মজুরি কম দেওয়া, পার্কের গাছের ফল বিক্রির টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া এবং পার্কে অবৈধ কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শুধু আর্থিক অনিয়মই নয়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে অসদাচরণ, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা না মানা এবং সরকারি নির্দেশনা অমান্য করার অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয়ে অতীতে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ ও সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সর্বশেষ অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের জন্য বিষয়টি গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
দাপ্তরিক নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান আরবরিকালচারিস্টের পদকে কেন্দ্র করে মোয়াজ্জেম হোসেন ও শেখ মোহাম্মদ কুদরত-ই-খুদার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এই বিরোধ একপর্যায়ে আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শেখ মোহাম্মদ কুদরত-ই-খুদাকে পদ থেকে সরিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের রিজার্ভে রাখা হয়। পরে নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদকে প্রধান বৃক্ষপালনবিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নথিপত্রে দেখা যায়, ২০১৭ সালে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-১-এ দায়ের করা একটি মামলায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, সরকারি কর্ম কমিশনের সচিব এবং প্রধান আরবরিকালচারিস্টকে নোটিশ দেওয়া হয়। ওই মামলার আবেদনকারী ছিলেন মোয়াজ্জেম হোসেন। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ১৬ মে দেওয়া একটি আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে শেখ মোহাম্মদ কুদরত-ই-খুদা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল (১২৫/২০২৫) করেন। আদেশটির কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে করা আবেদনের শুনানির জন্য ২০২৫ সালের ১৯ মে দিন ধার্য করেছিলেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক।
এদিকে মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাতের একটি অভিযোগও রয়েছে। দাপ্তরিক হিসাব অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের আরবরিকালচার বিভাগে বছরে প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই বিভাগের উপবিভাগ-২-এ দায়িত্ব পালনকালে ভুয়া ভাউচার ব্যবহার করে তিন মাসে ৬ হাজার ৯৫৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। বিষয়টি সামনে আসার পর ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-১-এর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবদুল কাদের চৌধুরী স্বাক্ষরিত চিঠিতে ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা জমা না দেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগের সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও দিতে পারেননি তিনি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বঙ্গভবন, গণভবন, জাতীয় সংসদ ভবন ও বাংলাদেশ সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় তাকে পদায়ন না করার সুপারিশও করা হয়েছিল।
তবে অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও বিভিন্ন ব্যক্তির সুপারিশ ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দায়িত্ব পাওয়ার চেষ্টা করেছেন মোয়াজ্জেম। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বিশ্বনাথ সরকার বিটু এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিমের লিখিত সুপারিশ কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, বঙ্গভবন ও রমনা পার্কের সবুজায়ন প্রকল্পে কাজের মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়। সেখানে প্রায় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০০৯ সালে চট্টগ্রামে এবং ২০১১ সালে রাজশাহীতে বদলি হন। ২০১২ সালে আবার ঢাকার গণপূর্ত ভবনে যোগ দিলে প্রথমে তাকে রিজার্ভে রাখা হয়। বর্তমানে তিনি আরবরিকালচার উপবিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে রাজধানীর দক্ষিণখানের আশকোনা পানির পাম্পের কাছে পাঁচ কাঠা জমির একটি প্লট কিনেছেন।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার দায়িত্ব থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার পর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই কর্মকর্তাকে অশালীন ভাষায় গালাগাল করার পাশাপাশি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করেন মোয়াজ্জেম। এ ঘটনার পর তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেন বর্তমান প্রধান বৃক্ষপালনবিদ আবুল কালাম আজাদ।
শ্রমিকদের মজুরি নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনসংলগ্ন এলাকায় আরবরিকালচারের কাজে নিয়োজিত দিনমজুর মনির অভিযোগ, সেখানে প্রায় ১৮০ জন দৈনিকভিত্তিক শ্রমিক কাজ করেন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সবার সমান হারে নির্ধারিত মজুরি পাওয়ার কথা থাকলেও মোয়াজ্জেম তাদের প্রাপ্য টাকা কম দিয়েছেন। এতে শ্রমিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পার্কের গাছের ফল বিক্রির অর্থ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মোয়াজ্জেমের দায়িত্বাধীন বিভিন্ন পার্কে প্রায় ২৪৫টি নারিকেল গাছ ও ১৪৫টি কাঁঠাল গাছ রয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এসব গাছের ফল উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি হিসাবে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম মেনে নিলাম না করে সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে ফল বিক্রি করা হয়। পরে সেই টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হয়। ফলে বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে না বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
পার্কের ভেতরে অবৈধ কর্মকাণ্ড চলার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন পার্কে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের অবাধে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু ব্যক্তি দর্শনার্থীদের অনুমতি ছাড়াই ছবি তুলে সেই ছবি দেওয়ার নামে টাকা দাবি করেন। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করা হয়। এমনকি দর্শনার্থীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে কার্যকর নজরদারি না থাকার পাশাপাশি অসাধু নিরাপত্তাকর্মী ও তদারককারীদের উৎকোচ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দাপ্তরিক কাজের ক্ষেত্রেও মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের কথা জানা গেছে। অফিসের নির্ধারিত সময় সকাল ৯টা হলেও তিনি সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিটের মধ্যে কর্মস্থলে উপস্থিত হতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া নিয়ম না মেনে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠানো এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগেও তাকে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ ও চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া ব্যাংকঋণ পরিশোধ না করার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ঢাকার প্রথম অর্থঋণ আদালতে অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের শেরাটন হোটেল শাখার দায়ের করা অর্থঋণ মামলা নম্বর ১০/২০১০-এর সমন অনুযায়ী, ব্যাংকের ২ লাখ ৬ হাজার ৫৩১ টাকা দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ি রয়েছে। এ নিয়ে আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এত অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে সারওয়ার জাহান জানান, মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এসেছে। এবারের অভিযোগগুলো যাতে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা যায়, সে জন্য বিষয়টি সরাসরি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে, মোয়াজ্জেম হোসেনের বক্তব্য জানতে রমনা পার্কে অবস্থিত উপবিভাগীয় কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। সেখানে কর্মরত সুপারভাইজার ফজলুল হক জানান, ঢাকা ক্লাবের পাশের পুরোনো কার্যালয়টি ভেঙে ফেলা হয়েছে। ফলে বর্তমানে কর্মকর্তার বসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো কক্ষ বা ব্যবস্থা নেই। এ কারণে মোয়াজ্জেম হোসেন বেশিরভাগ সময় গণপূর্ত অধিদপ্তরের কার্যালয়ে অবস্থান করেন।
পরে তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন ও খুদে বার্তা পাঠিয়ে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য চাওয়া হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। ফলে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, শ্রমিকদের মজুরি কম দেওয়া, ফল বিক্রির টাকা আত্মসাৎ এবং অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।