মেট্রোরেলের এমডি শওগাতুল আলমের বিরুদ্ধে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুই আবেদন
বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মেট্রোরেলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শওগাতুল আলমের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অনিয়ম, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং প্রকল্পের কাজে ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন আজিজুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আরেকটি পৃথক আবেদনেও বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরে তাঁর দায়িত্ব পালনের বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
গত ২৯ অক্টোবর পাঠানো আবেদনে শওগাতুল আলমের প্রশাসনিক কার্যক্রম, নিয়োগের যোগ্যতা, প্রকল্প পরিচালনায় দক্ষতা এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রভাব তদন্তের অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারী। আবেদনের অনুলিপি সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, মেট্রোরেলের চলমান উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে গুরুত্বপূর্ণ কাজে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
শুধু প্রকল্পের গতি নয়, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, এমডি মো. শওগাতুল আলমের বিরুদ্ধে অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর আচরণ ও সিদ্ধান্তের কারণে দাপ্তরিক কাজে সমন্বয়ের সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ, কারিগরি সহযোগিতা ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব কারণে প্রকল্পের কাজ, চুক্তি বাস্তবায়ন কিংবা ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
মেট্রোরেলের কারিগরি মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারী। আবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের স্থাপনা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, নির্মাণকাজ এবং রক্ষণাবেক্ষণের মান যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। নির্ধারিত নকশা, কারিগরি মান ও সময়সূচি অনুসরণ করে কাজ সম্পন্ন হচ্ছে কি না, তা স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
এমডির নিয়োগ ও পেশাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারীরা। তাঁদের দাবি, এত বড় একটি জাতীয় প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের জন্য শওগাতুল আলমের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও যোগ্যতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা দরকার। এ জন্য তাঁর আগের কর্মস্থলের দায়িত্ব, পেশাগত অভিজ্ঞতা, নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং বর্তমান পদে নিয়োগের পেছনে থাকা প্রয়োজনীয় নথিপত্র পর্যালোচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
দ্বিতীয় আবেদনে শওগাতুল আলমের কর্মজীবনের একটি বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, তিনি ২০১২ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটারের বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মেট্রোরেল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হন। আবেদনকারীদের প্রশ্ন, আগের কর্মস্থলে তাঁর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প পরিচালনার সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না।
এমডির প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষের কারণে তিনজন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন বলেও দ্বিতীয় আবেদনে দাবি করা হয়েছে। আবেদনকারীদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষের কারণে তাঁরা দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। তবে ওই তিন কর্মকর্তার নাম, পদত্যাগের সুনির্দিষ্ট কারণ কিংবা এ বিষয়ে কোনো দাপ্তরিক তদন্তের তথ্য আবেদনে দেওয়া হয়নি। ফলে এ দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, মেট্রোরেলের মতো বৃহৎ প্রকল্পে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এমডির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর কিছু সিদ্ধান্তের কারণে প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমে বিলম্বের পাশাপাশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা এবং কারিগরি কার্যক্রমেও সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব অভিযোগের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট নথি, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।
আবেদনকারীরা মনে করেন, মেট্রোরেল শুধু একটি পরিবহন প্রকল্প নয়, এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। জনগণের অর্থে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে নির্মিত এই ব্যবস্থার ওপর প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের যাতায়াত নির্ভরশীল। তাই প্রকল্পের অর্থের সঠিক ব্যবহার, নির্মাণকাজের মান বজায় রাখা এবং পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ব্যক্তির প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা অদক্ষতার কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হলে সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো আবেদনে মোট ছয়টি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের অনুরোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এমডির প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আচরণের অভিযোগ, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের সমস্যা, প্রকল্পের নির্মাণ ও কারিগরি মান যাচাই, নিয়োগের যোগ্যতা পর্যালোচনা এবং চলমান উন্নয়নকাজের অগ্রগতি পরীক্ষা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে মেট্রোরেলের ব্যবস্থাপনায় দক্ষ, অভিজ্ঞ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
তবে আবেদনকারীরা জানিয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তিকে আগাম দোষী সাব্যস্ত করা নয়। বরং উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা এবং মেট্রোরেলের প্রশাসনিক ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
এদিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেট্রোরেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওগাতুল আলমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো আবেদনগুলোতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।